ধর্মের দেওয়াল নাকি মিলনের শরৎ? দুর্গাপুজো থেকে ‘শারদোৎসব’ নাম ছাঁটাইয়ের বিতর্কে কোন পথে বাংলার সংস্কৃতি?

On the controversy over dropping the name ‘Sharadotsav’ from Durga Puja

বাংলার শারদোৎসব কেবল একটি ঋতুভিত্তিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সম্প্রীতি এবং সার্বিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় স্পন্দন। রামায়ণ-ঘোষিত অকালবোধন থেকে শুরু করে নদীমাতৃক বাংলার জমিদার বাড়ি, সেখান থেকে গুপ্তিপাড়ার বারোয়ারি এবং উনিশ-বিংশ শতকের হাত ধরে আজকের সর্বজনীন উৎসব—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দুর্গাপূজা পেয়েছে এক সর্বভারতীয় ও সর্বজনীন রূপ। ঋষিমূর্ত বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য বিবেকানন্দ কিংবা কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়—প্রত্যেকের মানসেই দুর্গোৎসব ও শরৎকালের আনন্দ মিশে ছিল বাঙালির সার্বিক মুক্তি এবং মিলনের অনুষঙ্গ হিসেবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে শারদোৎসব মানেই ছিল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মিলনের আনন্দ। শরৎকালের সুনীল আকাশ ও শিউলিঝরা প্রভাত তাঁর কাছে কেবল দেবীর আগমনী বার্তা ছিল না, তা ছিল মানুষের মনের ভেদাভেদ মুছে ফেলার এক প্রাকৃতিক আহ্বান। তিনি বিশ্বাস করতেন, উৎসব তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের সমস্ত স্তরকে এক সুতোয় বাঁধে। রবীন্দ্রনাথ তাই তো গেয়েছিলেন আনন্দের জয়গান, যেখানে কোনো বৈষম্য নেই, নেই কোনো ব্যবধান। বিশ্বকবির সেই চিরন্তন বাণী আজও বাজে প্রাণে— “উৎসবের আনন্দ কোনো একার নয়, তাহা সকলের—যাহা সমস্ত সমাজকে একত্র বাঁধিয়া রাখে, তাহাই প্রকৃত উৎসব।”

একইভাবে, স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তা ও দর্শনে শক্তি আরাধনার অর্থ ছিল দেশের সাধারণ মানুষের জাগরণ এবং মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি। ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিবেকানন্দ শক্তিপুজোকে দেখেছেন মানবকল্যাণ ও সর্বস্তরের মানুষের মুক্তির প্রতীক হিসেবে। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়— “যে ধর্মে সাধারণ মানুষের মুক্তি নেই, দেশের কল্যাণ নেই, তা ধর্ম নয়—সে তো কেবল আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বর।”

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর কথাসাহিত্যে বাঙালির এই সর্বজনীন আনন্দের ছবি এঁকেছেন নানাভাবে—যেখানে পুজো মানেই ধনী-দরিদ্র, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের একসঙ্গে মিলেমিশে প্রাণের উৎসব। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতেও মাতৃবন্দনা ও দেশমাতৃকার রূপ মিলেমিশ একাকার হয়ে গেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের নামকরণ এবং এর সার্বজনীন রূপকে ঘিরে এক নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষ থেকে দুর্গাপূজাকে ‘শারদোৎসব’ না বলে কেবল ‘দুর্গাপূজা’ বলার উপর জোর দেওয়ার কথা সামনে এসেছে। পাশাপাশি, অতীতে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানের বিপরীতে বর্তমান রাজনৈতিক পরিসরে ভিন্ন মত বা দৃষ্টিভঙ্গি জোরালো হচ্ছে।

এই ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে এক গভীর দূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথমত, ‘শারদোৎসব’ শব্দটির মধ্যে যে সর্বজনীনতার সুর ও ঋতুর উদার আবহ রয়েছে, তা কেবল একটি বিশেষ ধর্মীয় আচারের গণ্ডিতে বন্দি হলে উৎসবের পরিধি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যুগ যুগ ধরে বাংলার মণ্ডপগুলোতে সর্বধর্মের মানুষ যেভাবে হাত মিলিয়ে আনন্দ উপভোগ করে এসেছেন, এই বিভাজনমূলক ধারা তার মূলে আঘাত হানতে পারে। দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের বাংলায় সংস্কৃতিকে যদি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তবে তা আমাদের বহুত্ববাদী ও উদার সমাজচেতনার পরিপন্থী হবে।

ধর্ম যার যার হলেও আনন্দ ও উৎসব তো মানুষের মৌলিক অধিকার। দুর্গাপূজা আজ আর কেবল ঘটস্থাপন বা মন্ত্র উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাংলার অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য এবং সর্বোপরি সামাজিক সম্প্রীতির মহোৎসব। তাই একে সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আটকে না রেখে, এর সর্বজনীন ও শারদীয় আবেদনকে টিকিয়ে রাখাটাই আজকের দিনে বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ।