বালেশ্বরে ঝাউবনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘বনমানুষ’! ৫টি ওরাংওটান ছানা উদ্ধার ঘিরে তোলপাড়

5 orangutan infants rescued from Odisha’s casuarina grove

বিশেষ প্রতিবেদন:

ওড়িশার বালেশ্বর জেলার জলেশ্বর রেঞ্জের উদয়পুর-তালসারি উপকূলবর্তী ঝাউবন থেকে সম্প্রতি পাঁচটি বিরল প্রজাতির ছোট ওরাংওটান উদ্ধারকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। উদ্ধারের তালিকায় রয়েছে তিনটি পুরুষ ও দুটি নারী ওরাংওটান ছানা, যাদের বয়স আনুমানিক ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে। ভারতের বনাঞ্চলে এরা প্রাকৃতিক উপায়ে বাস করে না। এদের একমাত্র প্রাকৃতিক আবাসস্থল ভারত থেকে প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার দূরে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও এবং সুমাত্রা দ্বীপের গভীর বৃষ্টিঅরণ্য।

উপকূলীয় ঝাউবনে এই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের উপস্থিতি ভারতের আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের এক বিশাল জাল উন্মোচন করেছে। বন বিভাগ ও ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো (WCCB)-র প্রাথমিক ধারণা, পাচারকারীরা বিজাতীয় এই প্রাণীদের সড়ক বা জলপথে স্থানান্তরের সময় পুলিশের নজরদারি এড়াতে বা বিপদ বুঝে ঝাউবনে ফেলে পালিয়েছে।

পাচারের পথ ও আন্তর্জাতিক রুট

তদন্তকারীদের মতে, ওরাংওটানগুলোকে সরাসরি ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া থেকে ধরে মায়ানমার হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত (যেমন মিজোরাম) দিয়ে স্থলপথে অথবা সমুদ্রপথে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার উপকূলে আনা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক কালাবাজারে একটি ওরাংওটান ছানার দাম ক্ষেত্রবিশেষে ২৫ লাখ থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অতি মুনাফা ও আইনি পথে এদের সংগ্রহ করা অসম্ভব হওয়ায় কালোবাজারে এদের বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে।

কেন ভারতে এই অস্বাভাবিক চাহিদা?

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে অভিজাত ফার্মহাউসের মালিক, প্রভাব শালী ব্যক্তি এবং কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে বিদেশি প্রাণী (Exotic Pets) প্রদর্শনী ও পোষার এক ধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ওরাংওটানের ছানা দেখতে অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক হওয়ায় চোরাচালানকারীদের কাছে এটি একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

মানুষের সঙ্গে ৯৭% ডিএনএ মিল: প্রকৃতির বিস্ময় ‘হুটান’

মালয় ভাষায় ‘ওরাং’ শব্দের অর্থ ‘মানুষ’ এবং ‘হুটান’ শব্দের অর্থ ‘জঙ্গল’—অর্থাৎ ‘জঙ্গলের মানুষ’

  • বুদ্ধিমত্তা: এদের সঙ্গে মানব ডিএনএ-এর প্রায় ৯৭ শতাংশ মিল রয়েছে।
  • যন্ত্রের প্রয়োগ: বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে এরা বড় পাতা ব্যবহার করে এবং গাছের ডাল দিয়ে মৌচাক বা উইপোকা বের করে খেতে সক্ষম।
  • প্রতিদিনের নতুন বাসা: প্রতি রাতে ঘুমোনোর জন্য এরা গাছের ডালে পাতা বুনে নতুন বিছানা তৈরি করে।

বর্তমান অবস্থা

উদ্ধার হওয়া অসুস্থ ও পরিশ্রান্ত ছানাগুলোকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ভুবনেশ্বরের বিখ্যাত নন্দকানন চিড়িয়াখানায় পাঠানো হয়েছে। সেখানে চিকিৎসকদের কড়া নজরদারিতে তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের শিকড় কোথায়, তা উন্মোচনে রাজ্য বন বিভাগ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথ তদন্ত চালাচ্ছে।