The Debate Over Netaji’s True Ideals and Politics
বিশেষ প্রতিবেদন
সম্প্রতি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতি তুমুল উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতির নেতাজিকে নিয়ে বিতর্কিত ‘গুন্ডা’ মন্তব্য, অন্যদিকে দলেরই রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের নেতাজিকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলা এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা নিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য—সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের জল গড়াতেই পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামে রাজ্য সরকার। নেতাজিকে অসম্মান করার বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে কড়া ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার পরপরই অনন্ত মহারাজকে দেওয়া ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান কেড়ে নেওয়ার মতো বড় পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচনের মুখে ‘পরাক্রম দিবস’ পালন কিংবা রাজনৈতিক ড্যামেজ কন্ট্রোল করেই কি নেতাজির প্রতি আসল সম্মান জানানো সম্ভব? নাকি এটি নেতাজির বিপুল জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা? গবেষক শুভম শর্মার সাম্প্রতিক একটি ঐতিহাসিক গবেষণায় নেতাজির জীবনের বেশ কিছু স্পষ্ট ও অজানা সত্যি সামনে এসেছে, যা আজকের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জানা খুবই জরুরি।
১. মতভেদ থাকলেও শীর্ষ নেতাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা
ইতিহাস প্রমাণ করে, ১৯৩৯ সালে নীতির অমিল হওয়ায় নেতাজি কংগ্রেস ছেড়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি কখনো মহাত্মা গান্ধী বা জওহরলাল নেহরুকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ বা ছোট করেননি।
- ব্রিগেডের নাম: নিজের তৈরি ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ (INA)-র দলগুলোর নাম তিনি রেখেছিলেন—গান্ধী ব্রিগেড, নেহরু ব্রিগেড এবং আজাদ ব্রিগেড (মৌলানা আজাদের নামে)।
- গান্ধীজিকে শ্রদ্ধা: ১৯৪৩ সালে বিদেশে থাকা অবস্থায় গান্ধীজির ৭৪তম জন্মদিনে রেডিও বক্তৃতায় নেতাজি তাঁকে ‘অনন্য ও অতুলনীয়’ বলে সম্মান জানান।
- ডানপন্থীদের অনুপস্থিতি: লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাভারকর বা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো তৎকালীন কোনো ডানপন্থী নেতার নামে নেতাজি তাঁর দলের কোনো ব্রিগেডের নামকরণ করেননি। কারণ তাঁর চোখে জাতীয় আন্দোলনের আসল কণ্ডার ছিলেন গান্ধী-নেহরু-আজাদরাই।
২. সমাজতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস
নেতাজি নিজেকে সব সময় কংগ্রেসের বামপন্থী ভাবধারার সমর্থক মনে করতেন। তাঁর লেখা ‘The Indian Struggle’ বইতে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন যে, ভারতের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি এবং একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা।
আজকের দিনে যাঁরা ‘সমাজতন্ত্র’ বা ভিন্ন মতকে দেশবিরোধী বলে দাগিয়ে দিতে চান, নেতাজি কিন্তু তাঁর ঠিক উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক-কৃষকদের অধিকারের কথা বলতেন।
৩. শক্ত হাত ও কট্টর ধর্মনিরপেক্ষতা
রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের পথ ধরে নেতাজি সব সময় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি বলতেন, জাত-পাত বা ধর্মের বৈষম্য মুছে ফেলে সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে। ধর্মান্ধতা দূর করার একমাত্র উপায় হলো ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা।
- ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা: একবার সিঙ্গাপুরের একটি মন্দিরে নেতাজির কপালে চন্দনের ফোটা দেওয়া হলে, মন্দির থেকে বেরিয়েই তিনি তা মুছে ফেলেন। তিনি পরিষ্কার বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি ও ধর্মাচরণকে কখনো গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
- সবাইকে একসাথে নিয়ে চলা: আজাদ হিন্দ ফৌজের মূলে ছিল সব ধর্মের মানুষের একতা। তাঁর সেনাদলের মূল মন্ত্রের জন্য তিনি তিনটি উর্দু শব্দ বেছে নিয়েছিলেন—ইতমোদ (বিশ্বাস), ইত্তেফাক (ঐক্য) ও কুরবানি (ত্যাগ)।
৪. হিন্দু মহাসভা ও সাভারকরের রাজনীতির সমালোচনা
১৯৪০-এর দশকে তৎকালীন হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ে নেতাজি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। সাভারকর ও জিন্নাহর সাথে বৈঠকের পর নিজের বইতে নেতাজি লেখেন:
“জিন্নাহ সাহেব কেবল কীভাবে ব্রিটিশদের সাহায্যে পাকিস্তান তৈরি করা যায় তা ভাবছিলেন… আর সাভারকর মহাশয় বিশ্ব পরিস্থিতি ভুলে গিয়ে ভাবছিলেন কীভাবে ব্রিটিশদের অধীনেই হিন্দুদের সেনা প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। তাঁদের থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনের জন্য বিশেষ কিছু আশা করা যায় না।”
এমনকি সেসময় বাংলার কিছু গোঁড়া উচ্চবর্ণের গোষ্ঠী নেতাজি ও তাঁর দাদা শরৎচন্দ্র বসুর তীব্র বিরোধিতা করেছিল, কারণ বোস ভাইয়েরা জমিদারি প্রথা ও বর্ণপ্রথা ভেঙে সমাজ সংস্কারের পক্ষ নিয়েছিলেন।
৫. ইতিহাস বিকৃতির জবাব: হিন্দু-মুসলিম যৌথ লড়াই
নেতাজি তাঁর আত্মজীবনীতে স্পষ্ট উল্লেখ করেন যে, ইংরেজ আসার আগে ভারতে তথাকথিত ‘মুসলিম শাসন’ বলে যা চালানো হয় তা ভুল। মোগল আমল থেকে শুরু করে বাংলার নবাবদের শাসন—সব জায়গাতেই হিন্দু ও মুসলিমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রশাসন ও সেনাবাহিনী চালিয়েছেন। পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বস্ত সেনাপতি মীর মদনের সাথে মোহনলালও (যিনি হিন্দু ছিলেন) বীরত্বের সাথে প্রাণ দিয়েছিলেন।
শেষ কথা
আজকের দিনে নেতাজির সেনাদল গঠন ও সামরিক বীরত্বের কথা বলা হলেও, তিনি যে অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন ভারতের স্বপ্ন দেখতেন—তা প্রায়ই আড়াল করে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি বা সেন্টিমেন্ট কাজে লাগানোর চেষ্টা প্রমাণ করে যে, নেতাজির আসল আদর্শকে আমরা কতটা ভুলে গেছি। নেতাজি কেবল ভোটের প্রচারের কোনো নাম নন; তিনি ছিলেন এমন এক ঐক্যের প্রতীক, যা সব ভেদাভেদ ভুলে পুরো দেশকে এক সুতোয় বেঁধেছিল।
তথ্যসূত্র-subham Sharma Article-Netaji Wasn’t a Friend of Hindutva, But its Adversary. The author is an independent research scholar. Courtesy: Newsclick
