হালিশহরে পুলিশ হেফাজতে তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু: আইসি ক্লোজড, তদন্তকারী আধিকারিক সাসপেন্ড

Death of Trinamool worker in police custody in Halishahar: IC ‘closed’, investigating officer suspended.

নিহতের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা, স্ত্রীকে চাকরি; মমতার ‘পাথর ছোড়া’ ও ‘খুনের ছক’-এর অভিযোগ খারিজ শুভেন্দুর

বিশেষ প্রতিবেদন

হালিশহর: উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে তৃণমূল কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে কড়া পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। হালিশহর থানার আইসি তমাল দত্তকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করার পাশাপাশি তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে জেলাশাসকের নেতৃত্বে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী। নিহতের স্ত্রীর হাতে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর চাকরির ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি। নিহতের দুই সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্বও সরকার নেবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

‘পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু দিনের আলোর মতো সত্য’

নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে কীভাবে এবং কতটা শারীরিক অত্যাচারের কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “যে পুলিশের লকআপে বা হেফাজতে মারা গিয়েছে, এটা দিনের আলোর মতো সত্য। কতটা শারীরিক অত্যাচারে মারা গিয়েছে বা কীভাবে মারা গিয়েছে, এটা আমি বা ডিজিপি সাহেব বলতে পারব না। তিনজন ডাক্তারের নেতৃত্বে যে পোস্টমর্টেম হয়েছে, পিএম রিপোর্টে পাওয়া যাবে।”

তিনি জানান, তিন চিকিৎসকের একটি দলের নেতৃত্বে ভিডিয়োগ্রাফি করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে।

আইসি ক্লোজড, তদন্তকারী আধিকারিক সাসপেন্ড

ঘটনার তদন্তে প্রাথমিকভাবে দুই পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

তাঁর ঘোষণা, হালিশহর থানার আইসি তমাল দত্তকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে এবং তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলাশাসকের নেতৃত্বে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিহতের স্ত্রীকে ১০ লক্ষ টাকা ও চাকরি

নিহতের স্ত্রী স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলর। তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকার আর্থিক সহায়তা এবং চাকরির ব্যবস্থা করেছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রাণ তহবিল থেকে নিহতের স্ত্রীকে ১০ লক্ষ টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাঁকে অ্যাটেনডেন্ট পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথম ১২ মাস মাসে ১৫ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হবে এবং এক বছর পর গ্রুপ-ডি পদে তাঁর চাকরি স্থায়ী করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

নিহতের দুই সন্তানের নামেও অর্থ গচ্ছিত রাখার ব্যবস্থা করা হবে। তাঁদের পড়াশোনার খরচও সরকার বহন করবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

মমতার অভিযোগ সরাসরি খারিজ শুভেন্দুর

হালিশহরে নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে রবিবার বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ ছিল, তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখানোর পাশাপাশি গাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ও কাদা ছোড়া হয়েছিল। এমনকী তাঁকে খুনের ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

সোমবার সেই সমস্ত অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে দেন শুভেন্দু অধিকারী।

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, রবিবারের ঘটনা ছিল “সম্পূর্ণ জনরোষ”। তাঁর বক্তব্য, বিক্ষোভকারীরা পাথর ছোড়েননি এবং ঘটনায় বিজেপির কেউ জড়িত ছিলেন না।

তিনি বলেন, “কমপ্লিটলি পাবলিকের জনরোষ হয়েছে। কিচ্ছু হবে না। কেউ পাথর ছোঁড়েনি। ছবিতে পুলিশ দেখেনি।”

রবিবারের ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, প্রশ্ন করা হলে মুখ্যমন্ত্রীর সংক্ষিপ্ত জবাব, “কোন ব্যবস্থা? নো নিড।”

‘জানিয়ে এলে ব্যবস্থা নিতাম’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হালিশহর সফর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পুলিশকে আগে থেকে না জানিয়েই এলাকায় এসেছিলেন।

শুভেন্দুর বক্তব্য, “গতকাল না জানিয়ে এসেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। কিছুই ঘটেনি, পাথরের গল্প মানুষ দেখেছে। বিজেপির কেউ জড়িত নন। কমপ্লিটলি পাবলিক জনরোষে হয়েছে। আপনি জানিয়ে আসলে ব্যবস্থা নিতাম। আপনি পুলিশকে জানিয়ে আসেননি।”

ফলে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে যেমন প্রশাসনিক ও ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে, তেমনই রবিবারের বিক্ষোভ ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও অব্যাহত রয়েছে। এখন ময়নাতদন্ত ও তদন্তের রিপোর্টের দিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।