আজান, চোঙা এবং ‘গেরুয়া’ জাদুর কাঠি: তিন মাসের বঙ্গ-কিসসা!

A humorous political feature on the removal of loudspeakers from mosques.

সবজান্তা :

“মাইকটা কিন্তু বাঁকা নয়, সোজা!”— তিন মাস ধরে বাংলার সাধারণ মানুষ যা দেখছে, তাতে শব্দদূষণ কমুক বা না কমুক, কানঝালাপালা হওয়াটা একদম কনফার্ম।

ভোটের আগে কথা হয়েছিল, সনাতনী হাওয়া বইবে। তা হাওয়া এমন জোরে বইল যে, তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক-সাংসদেরা রাতের অন্ধকারে সবুজ পাঞ্জাবি আলমারিতে তুলে রেখে এক লাফে একপোচ গেরুয়া রং মেখে নিলেন। এখন কে কার চেয়ে বড় ‘পদ্ম অনুগামী’ আর ‘জোড়াফুল বিরোধী’, তা প্রমাণের প্রতিযোগিতা দেখলে অলিম্পিকের দৌড়বিদরাও লজ্জা পাবেন! কিন্তু তিন মাস যেতে না যেতেই দেখা গেল, সেই হাওয়া আসলে চলে যাচ্ছে মসজিদের চোঙার মুখ দিয়ে!

রাজ্যের অলিতে-গলিতে এখন পুলিশের নতুন ডিউটি— স্কেল ফিতে নিয়ে মাইকের চোঙা মেপে বেড়ানো। যে চোঙা দিয়ে আগে আজান বা কীর্তন আসত, সেই চোঙা এখন ট্রাফিক পুলিশের সাইরেনের ভয়ে উধাও। বলা হচ্ছে, পরিবেশ রক্ষা ও শব্দ জব্দ করা হচ্ছে। কিন্তু বাজারে তো জোর গুঞ্জন— এ শব্দ জব্দের আড়ালে আসল রাজনৈতিক ঢাকঢোল পেটানোর উদ্দেশ্য অন্য কিছু! দলবদলু নেতারা এখন বুক ঠুকে বলছেন, “ভোট যখন দাওনি, তখন কাজের দাবি করতে আসছ কেন বাপু?” একদম খাঁটি ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ!

এদিকে নতুন সরকারের মন্ত্রীদের দাপট আবার এক ধাপ উপরে। নগরোন্নয়ন থেকে শুরু করে কার পার্কিং— রোজ সকালে টিভিতে এসে এমন সব নতুন কড়া আইন আর আর্থিক জরিমানার তালিকা ঘোষণা করা হচ্ছে । আবার পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে রাস্তাঘাট অপরিস্কার করলেই স্পট ফাইন দিতে হবে। বিশেষ করে যাদের রাস্তাঘাটে খোলা জায়গায় মল মূত্র , থুতু ফেলার বাতিক আছে তাদের কপালে খুব কষ্ট আছে। পেনাল্টি খেতে খেতে পকেট পগার পার হয়ে যাবে। অনেকটাই শরৎচন্দ্রের ‘মেজদা’ গল্পের মতো! মেজদা যেমন পড়তে বসে একটু উঠে যাওয়ার বাহানা খুঁজলেই হাঁচি, কাশি বা হাই তোলার জন্য চিরকুট লিখে স্বাক্ষর করাতে হতো, আমাদের মাননীয় মন্ত্রীরাও তেমনই সাধারণ মানুষের হাঁটা-চলা, ব্যবসা-বাণিজ্য— সবেতেই নিত্যনতুন ‘জরিমানা-চিরকুট’ ধরিয়ে দিচ্ছেন। সাধারণ বাঙালি এখন ভাবছে— শহরের রাস্তা মেরামত বা উন্নয়ন পরে হবে, আগে তো মেজদা-রূপী সরকারের এই চালানের ভয় সামলানো দরকার!

তার ওপর সামাজিক সুরক্ষার নানা প্রকল্প কিংবা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর নাম বদল আর নতুন ফরম পূরণের চক্কর! নিয়মকানুনের যা বহর, তাতে সাধারণ মানুষ নথিপত্র জোগাড়ের লাইনে দাঁড়িয়ে ভাবছে— সুবিধা পাওয়ার আগেই বুঝি সরকারি আবেদনের বয়সের সীমা পার হয়ে যাবে!

আর রেশনের অবস্থা? চাল-গম পেতে গেলে এখন ই-কেওয়াইসি, আঙুলের ছাপ আর ‘ডিজিটাল ফেস লক’-এর যে কঠিন গেরোয় পড়তে হচ্ছে, তাতে আমজনতার মনে হচ্ছে— রেশন দোকান থেকে দু-কেজি চাল আনা আর মহাকাশ গবেষণা সংস্থার রকেট উৎক্ষেপণ— দুটোই সমান জটিল কাজ! প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, সাধারণ মানুষের পেটের ভাত তত পিছিয়ে যাচ্ছে।

এমনকি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ছালচামড়াও উঠে আসছে প্রতিদিন। হাসপাতালের লম্বা লাইন আর জরুরি ওষুধের আকাল নিয়ে প্রশ্ন তুললেই বলা হচ্ছে— “ধৈর্য ধরুন, ব্যবস্থা ‘ডিজিটাল’ হচ্ছে!” কিন্তু রোগ তো আর ডিজিটাল নিয়মের তোয়াক্কা করে না!

এর মধ্যেই যুক্ত হয়েছে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন আর পুরসভার দুর্নীতি নিয়ে তদন্তের নিত্যনতুন নাটকিয়তা। সিবিআই-ইডি-র হানায় যখন একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার চলছে, আর তিন মাসের নতুন সরকারের পারফরম্যান্স দেখে সাধারণ মানুষের কপালে ভাঁজ চওড়া হচ্ছে, ঠিক তখনই রাজনৈতিক ধোঁয়াশা তৈরি করতে উড়ে এসে জুড়ে বসল— ‘মাইক কিসসা’!

এখন চায়ের দোকানে তুখোড় আলোচনা: — “হ্যাঁহে, মসজিদের মাইকটা না হয় খুলল, কিন্তু রেশন দোকানে চাল আর ই-কেওয়াইসির প্যাচটা খুলবে কবে?” — “আরে ছাড়েন তো ভাই! আগে কোনটা বেশি জোরে বাজছে হিসাব করুন— মন্ত্রীর জরিমানার হুঙ্কার, ডেঙ্গির মশার গুণগুণ, নাকি মাইকের অভাবের নীরবতা?”

রাজনীতির হাওয়া যেদিকেই ঘুরুক, বাঙালি এখন খুব ভালো করেই বুঝে গেছে— পকেটের টাকা কমুক আর পেটের চাল কমুক, সামনের কয়েক মাস রাজপথের আসল সমস্যাগুলো ঢাকা দিতে চায়ের কাপে ঝড় তোলার জন্য ওই ‘মাইকের চোঙা’ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মোক্ষম জাদুর কাঠি নেই!