দিল্লির ছায়া এবার রাঁচিতে: চাকরির পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগে উত্তাল ঝাড়খণ্ড

Jharkhand Student Movement

বিশেষ প্রতিবেদন

রাঁচি: দিল্লির যন্তর মন্তরের কথা মনে আছে? যেখানে বঞ্চনা আর অধিকারের দাবিতে বারবার সুর চড়িয়েছেন দেশের যুবসমাজ। এবার তেমনই এক প্রতিবাদী মেজাজের সাক্ষী রাজধানী রাঁচি। তবে কোনো গোলমাল বা লাঠিচার্জ নয়—একদম শান্ত ও সুশৃঙ্খল আন্দোলনের মধ্য দিয়েই রাজ্যের রাজনীতি তোলপাড় করে দিয়েছেন শত শত চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষার্থী।

কবে থেকে এবং কেন এই আন্দোলন? গত ২৫ জুলাই থেকে রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে অবস্থান বিক্ষোভে বসেছেন হাজারও তরুণ-তরুণী। আন্দোলনের মূল কারণ—ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (JPSC) এবং স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (JSSC-CGL) মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ব্যাপক দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস এবং ‘পেপার ফিক্সিং’-এর গুরুতর অভিযোগ। আন্দোলনকারী ছাত্রদের দাবি, যে সংস্থাকে দিয়ে পরীক্ষার কাজ করানো হয়েছে (যেমন টিএসআর ডাটা প্রসেসিং প্রাঃ লিঃ), তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। একই সাথে ১৪তম JPSC প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল করে পুরো কেলেঙ্কারির সিবিআই (CBI) তদন্তের দাবি তুলেছেন তারা। ওএমআর শিটে ‘নট অ্যাটেম্পটেড’ অপশন চালু করা এবং গোটা নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার দাবিতে অনড় ছাত্র সমাজ।

আন্দোলনে কারা যুক্ত ও জাতীয় রাজনীতির প্রতিক্রিয়া: এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন সর্বভারতীয় একাধিক ছাত্র সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-র সর্বভারতীয় সভানেত্রী নেহা বোরা নিজে এসে বিধানসভা অভিযানের ডাক দিয়েছেন। শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক ভিডিও কলে আন্দোলনকারী নেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোর সঙ্গে কথা বলে সমর্থনে পাশে দাঁড়িয়েছেন।

রাজনীতির হাওয়াও এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বেশ গরম।

  • বিরোধী শিবিরের বক্তব্য: বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপি নেতা বাবুলাল মারান্ডি বিক্ষোভস্থলে গিয়ে ছাত্রদের দাবিকে ‘সম্পূর্ণ ন্যায্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আদালতের নজরদারিতে সিবিআই তদন্ত এবং মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের পদত্যাগের দাবি তুলেছে বিজেপি। এমনকি আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও ঝাড়খণ্ড সরকারকে ছাত্রদের দাবি মেনে নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন।
  • শাসক জোটের সমর্থন: অবাক করার মতো বিষয় হলো, ক্ষমতাসীন সোরেন সরকারের জোটসঙ্গী কংগ্রেসও কিন্তু ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এনএসইউআই (NSUI) সভাপতি বিনোদ জাখর আন্দোলনস্থলে পৌঁছে সমর্থন জানিয়েছেন, আর কংগ্রেস নেতা বন্ধু তিরকি ছাত্রদের খাবারের ব্যবস্থা করে নৈতিক সমর্থন পাঠিয়েছেন। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও সংহতি জানিয়েছেন।

দিল্লির যন্তর মন্তরের সাথে কোথায় তফাত? দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন থামাতে পুলিশের লাঠিচার্জ বা টিয়ার গ্যাসের দৃশ্য হামেশাই চোখে পড়ে। কিন্তু রাঁচির চিত্রটি অনেকটাই আলাদা। এখানে রাজ্য পুলিশ বা প্রশাসন ছাত্রদের ওপর কোনো বলপ্রয়োগ করেনি। প্রতি সন্ধ্যায় যখন আন্দোলনকারী ছাত্ররা মোমবাতি মিছিল বা জাতীয় পতাকা নিয়ে ‘তিরঙ্গা যাত্রা’ বের করছেন, তখন শহরের সাধারণ মানুষ, চাকরিপ্রার্থী ও অভিভাবকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে তাদের সাথে পা মেলাচ্ছেন। শান্ত-কঠোর এই জনসংযোগই রাঁচির আন্দোলনকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

কী বলছে সরকার? মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি এখন শুধু ঝাড়খণ্ডের নয়, সারা দেশের সমস্যা। ইতোমধ্যে সিআইডি (CID) তদন্ত করছে, ১৯ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে এবং চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গঠন করা হয়েছে ছাত্রদের সাথে আলোচনার জন্য। তবে ছাত্ররা সাফ জানিয়ে দিয়েছে—অস্পষ্ট আশ্বাস নয়, সিবিআই তদন্ত ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগের লিখিত সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাদের এই ‘রাঁচি কিসসা’ থামছে না।

তথ্য সূত্র- দি হিন্দু