Double Murder in Nakashipara and the ‘Rule of Law’
বিশেষ তদন্তমূলক প্রতিবেদন
নদীয়ার নাকাশিপাড়ার নাগাদি রেলগেটের নির্জন রাস্তা। শনিবার গভীর রাতে সেখানে ওত পেতে থাকা দুষ্কৃতীদের বোমাবাজি, এলোপাথাড়ি গুলি এবং ধারাল অস্ত্রের কোপ কেড়ে নিল নাকাশিপাড়া ব্লক কংগ্রেস সভাপতি আনিসুর রহমান ও তাঁর তরুণ আইনজীবী ছেলে আবু সুফিয়ানের প্রাণ। এই রক্তস্নাত জোড়া হত্যাকাণ্ড শুধুই রাজনৈতিক শত্রুতার সমীকরণ নয়, বরং প্রশ্ন তুলে দিল রাজ্যের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার ওপর।নাবালিকা ধর্ষণ-খুন থেকে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, এনকাউন্টার সংস্কৃতি কিংবা রাজনৈতিক নেতার প্রকাশ্যে খুন—সরকার বদলালেও পরিস্থিতির আদৌ কোনো পরিবর্তন হলো কি না, তা নিয়ে এখন তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোন সমীকরণ?
তদন্তে নেমে পুলিশ হরনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ফতেমা বিবি, সাহেব আলি মণ্ডল ও মিঠুন শেখসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। কিন্তু এই খুনের পেছনে উঠে আসছে একাধিক স্পর্শকাতর সূত্র:
- পঞ্চায়েতের রাশ ধরে রাখার লড়াই: কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, নাকাশিপাড়া অঞ্চলে আনিসুর রহমান ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তৃণমূলের দখলে থাকা অন্তত তিনটি পঞ্চায়েত হাতবদল হওয়ার মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে অনেক পঞ্চায়েত সদস্য কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলেন। সেই ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকেই কি খুন?
- পুরনো আক্রোশ ও রাজনৈতিক ঈর্ষা: নিহত নেতার পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় তৃণমূল নেতা জুব্বার শেখের মদতেই এই ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিকভাবে পেরে না উঠেই বাড়ি ফেরার পথে বাবা-ছেলেকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে।
নতুন সরকার ও ‘আইনের শাসন’-এর বৈপরীত্য
১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার হাত থেকে মুক্তি পেতে এ রাজ্যের বড় অংশ ভরসা রেখেছিল নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর। মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসে ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’-এর হুঙ্কার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাত্র তিন মাসের অভিজ্ঞতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে:
- অপরাধ দমনে পুলিশি ব্যর্থতা: অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়ার বদলে প্রশাসনিক নজর যেন বেশি ঘুরছে বিরোধী স্বর দমন ও প্রতিবাদীদের গ্রেফতার করার দিকে।
- হেফাজতে মৃত্যু ও শর্টকাট বিচার: কাঁচড়াপাড়ায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু কিংবা বারুইপুরের নাবালিকা খুনের অভিযুক্তকে বিতর্কিত এনকাউন্টারে খতম করার মতো ঘটনা প্রমাণ করে, সাধারণ আইনি ব্যবস্থার ওপর প্রশাসন কতটা শিথিল।
- অসহায় বিরোধী শিবির: রাজ্যে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও ডিম-বৃষ্টির মতো ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
সোনার পাথরবাটি কি হয়ে থাকবে বিচার?
যে রাজ্যে ক্ষমতা পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে একের পর এক নৃশংস অপরাধ, হেফাজতে মৃত্যু এবং রাজনৈতিক রক্তপাত ঘটে, সেখানে ‘আইনের শাসন’ বজায় রাখার দাবি কি স্রেফ এক সোনার পাথরবাটি? নাকাশিপাড়ায় বাবা-ছেলের তাজা রক্ত সেই প্রশ্নটাই আরেকবার স্পষ্ট করে রাজপথে রেখে গেল।
