অন্নপূর্ণার টাকায় ক্ষোভের পাহাড়: বাংলার মহিলা ভোট কি এবার বিজেপির মাথাব্যথার কারণ হতে চলেছে?

BJP in a bind over the ‘mountain of resentment’ regarding Annapurna’s funds.

৩,০০০ টাকার প্রতিশ্রুতি থেকে যাচাই-বাছাইয়ের জটিলতা—মাত্র তিন মাসেই কেন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ? সামনে পঞ্চায়েত ও পুরভোট, তার আগে মহিলাদের অসন্তোষ কতটা রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?

বিশেষ প্রতিবেদন

“এম ভিটামিন”-এর রাজনৈতিক শক্তি যে কতটা, গত কয়েক দিনের বাংলার ছবি যেন তারই বাস্তব প্রমাণ। অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া, আবেদন বাতিল হওয়া কিংবা যাচাই প্রক্রিয়ায় নাম আটকে থাকার অভিযোগে জেলার পর জেলা মহিলাদের বিক্ষোভে উত্তপ্ত। কোথাও বিডিও অফিস ঘেরাও, কোথাও রাস্তা অবরোধ, কোথাও রেল অবরোধ—ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ক্রমশই তীব্র হচ্ছে। ফারাক্কা, সাগরদিঘি, ধুলিয়ান, বিরাটি, রাজপুর-সোনারপুর-সহ একাধিক এলাকায় এমন বিক্ষোভের খবর সামনে এসেছে। এখানেই প্রশ্নটা রাজনৈতিক। মাত্র কয়েক মাস আগে যে বিজেপি সরকার মহিলাদের সামনে মাসে ৩,০০০ টাকার প্রতিশ্রুতি রেখে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারের আমলেই যদি প্রকল্পের টাকা নিয়ে মহিলাদের একটা অংশ রাস্তায় নেমে পড়েন, তাহলে আগামী দিনের ভোটের অঙ্কে তার প্রভাব পড়বে না—এমনটা ধরে নেওয়া কঠিন।

১,৫০০ থেকে ৩,০০০: প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থেকেই শুরু

বিধানসভা নির্বাচনের আগে মহিলাদের সামনে বিজেপির অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’। তৎকালীন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ১,৫০০ টাকার পরিবর্তে ৩,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। নির্বাচনের পরে নতুন সরকার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোয় এবং জুন থেকে অন্নপূর্ণা যোজনা চালু করার কথা ঘোষণা করে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পুরনো লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বহু উপভোক্তাকে নতুন প্রকল্পে স্থানান্তরের কথাও বলা হয়েছিল।অর্থাৎ রাজনৈতিক বার্তাটা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জায়গায় আরও বেশি টাকা, আরও বড় সামাজিক সুরক্ষা।কিন্তু সমস্যা শুরু হয়েছে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাটিতে।

টাকা বাড়ল, কিন্তু বাড়ল যাচাইও

লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের তুলনায় অন্নপূর্ণা যোজনায় তথ্য যাচাইয়ের পরিধি অনেক বেশি। আবেদনপত্রে পরিবারের সদস্য, জমি, বাড়ি, যানবাহন, আয়, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, রেশন-সহ একাধিক তথ্য চাওয়া হচ্ছে। চার চাকার গাড়ি রয়েছে কি না, তিন বা তার বেশি পাকা ঘর রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নও ফর্মে রাখা হয়েছে।পরবর্তীতে সরকার আবেদনকারীর নিজের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকার বেশি কি না এবং পরিবারের বার্ষিক আয় ১২ লক্ষ টাকার বেশি কি না—সেই মাপকাঠিও স্পষ্ট করেছে। নির্দিষ্ট সরকারি চাকরি বা নিয়মিত সরকারি বেতন-পেনশনপ্রাপ্তরাও যোগ্য নন।সরকারের যুক্তি, সরকারি অর্থ প্রকৃত উপভোক্তার কাছেই পৌঁছতে হবে। তাই পুরনো তালিকার ভুলত্রুটি সংশোধন এবং নতুন করে যাচাই প্রয়োজন।কিন্তু রাজনৈতিক সমস্যা অন্য জায়গায়।

একজন সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক যাচাইয়ের যুক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল—“আমি টাকা পেলাম কি পেলাম না?”

সেখানেই তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ।

গাড়ি থাকলেই সচ্ছল? এখানেই প্রশ্ন

বাংলার গ্রাম ও মফস্‌সলের অর্থনীতির বাস্তবতা শহরের কাগজে-কলমের হিসাবের সঙ্গে সবসময় মেলে না।

একটি পরিবার জীবিকার জন্য ঋণ নিয়ে চার চাকার গাড়ি কিনতে পারে। সেই গাড়ি চালিয়ে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হয়তো সংসার চালান। গাড়ির মালিকানা আছে মানেই পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল—এমন সরল সমীকরণ বাস্তবে সবসময় কার্যকর নয়।

একইভাবে, বহু গ্রামীণ পরিবারে পৈতৃক বাড়ি রয়েছে। বাড়িটি হয়তো বহু বছর আগে তৈরি। কিন্তু পরিবারের বর্তমান আয় সামান্য। ফলে সম্পত্তি, বাড়ি বা যানবাহনের মতো দৃশ্যমান সম্পদের সঙ্গে বর্তমান নগদ আয় ও জীবনযাত্রার বাস্তব অবস্থার পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্রে এই সমস্ত তথ্য চাওয়ার উদ্দেশ্য সরকারের কাছে যাচাই হলেও, আবেদনকারীদের একটা অংশের কাছে সেটাই হয়ে উঠছে বঞ্চনার কারণ।

ক্ষোভের আসল জায়গা ‘তুলনা’

রাজনীতিতে ক্ষোভ অনেক সময় শুধু বঞ্চনা থেকে তৈরি হয় না। তৈরি হয় তুলনা থেকে।

একই পাড়ায় একজন মহিলা মাসে ৩,০০০ টাকা পাচ্ছেন, পাশের বাড়ির আর একজন পাচ্ছেন না—তখন দ্বিতীয় পরিবারের কাছে সরকারি নিয়মের ব্যাখ্যা যতই দেওয়া হোক, প্রথম প্রশ্নটা হয়, “কেন?”

এই মনস্তত্ত্বই অন্নপূর্ণা বিতর্ককে প্রশাসনিক সমস্যা থেকে রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত করতে পারে।

বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় টাকা পাচ্ছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১৭ লক্ষ আবেদন বাতিল এবং আরও প্রায় ১৪ লক্ষ আবেদন যাচাইয়ের অপেক্ষায় থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।

অর্থাৎ সমস্যাটির আকার ছোট নয়।

সরকারের সামনে এখন ‘দুই বিপদ’

সরকারের সামনে এখন একসঙ্গে দুটি চ্যালেঞ্জ।

প্রথমত, প্রকৃত অযোগ্যদের বাদ দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যোগ্য কোনও পরিবার যেন ভুল যাচাইয়ের কারণে বাদ না পড়ে।

প্রথম কাজটি করতে গিয়ে দ্বিতীয়টিতে ভুল হলে রাজনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। আবার সবাইকে নির্বিচারে টাকা দিলে সরকারের আর্থিক বোঝা এবং প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা—দুই নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।

এই কারণেই সরকার এখন বাতিল আবেদনকারীদের জন্য ‘ক্লেম অ্যান্ড অবজেকশন’ ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে। নতুন পোর্টালের মাধ্যমে আবেদনকারীরা নিজেদের আবেদনের অবস্থা জানতে এবং প্রয়োজন হলে আপত্তি জানাতে পারবেন।

এটি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ড্যামেজ কন্ট্রোলও বটে।

কারণ বিজেপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মহিলা ভোটে

বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে মহিলা ভোট ইতিমধ্যেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তার অন্যতম বড় উদাহরণ। বিজেপি ক্ষমতায় এসে সেই রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই স্বীকার করে অন্নপূর্ণা যোজনায় মাসিক অনুদান দ্বিগুণ করেছে।

কিন্তু এখানেই বিজেপির জন্য ঝুঁকি।

যে ভোটব্যাঙ্ককে আকৃষ্ট করার জন্য ৩,০০০ টাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেই ভোটব্যাঙ্কের মধ্যেই যদি ‘প্রতিশ্রুতি বনাম প্রাপ্তি’র ফারাক তৈরি হয়, তা হলে ক্ষোভ সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে যেতে পারে।

এখনও অবশ্য বলা যাবে না যে এই বিক্ষোভ সরাসরি বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক ভেঙে দিয়েছে। কারণ বিপুল সংখ্যক মহিলা ইতিমধ্যেই টাকা পাচ্ছেন এবং সরকারও সমস্যাগ্রস্ত আবেদনকারীদের পুনরায় সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করছে।

কিন্তু রাজনৈতিক সতর্কবার্তাটা স্পষ্ট।

বিরোধীদের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন অস্ত্র

তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে এতদিন ছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম বিজেপির প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক তুলনা। এখন তারা আরও শক্তিশালী একটি প্রশ্ন তুলতে পারে—

“যে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছিলেন, সেই টাকা সবাই পাচ্ছেন তো?”

বিরোধীরা যদি প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এই প্রশ্নকে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে অন্নপূর্ণা যোজনা শুধুমাত্র একটি সরকারি প্রকল্প থাকবে না; তা হয়ে উঠতে পারে ‘প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবায়ন’-এর প্রতীক।

অন্যদিকে বিজেপিও বসে নেই। দলের তরফে ইতিমধ্যেই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়া মহিলাদের সামনে এনে সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রচার চালানোর পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে।

অর্থাৎ আগামী দিনে লড়াইটা শুধু টাকা দেওয়া নিয়ে নয়—কে এই প্রকল্পের রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেবে, সেটাও হবে বড় প্রশ্ন।

ডিমের রাজনীতি কি অন্নপূর্ণার রাজনীতিকে ছাপিয়ে যাবে?

রাজ্য রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ডিম ছোড়ার মতো ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। বিজেপির একাংশ প্রকাশ্যে এই ধরনের ঘটনাকে সমর্থন না করলেও, বিরোধীদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা।

এখানে ক্ষোভের উৎস কোনও রাজনৈতিক স্লোগান নয়। ক্ষোভের কেন্দ্র সরাসরি পরিবারের মাসিক আয়।

তাই এই ক্ষোভকে শুধুমাত্র বিরোধীদের উসকানি বলে উড়িয়ে দিলে সরকারের ভুল হতে পারে। কারণ টাকা না পাওয়া মহিলার কাছে রাজনৈতিক দল নয়, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই প্রথম সত্য।

সামনে আরও বড় পরীক্ষা

অন্নপূর্ণা যোজনার পরেও সরকারের সামনে একাধিক সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প সামলানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বার্ধক্যভাতা, যুবসমাজের জন্য বিভিন্ন সহায়তা এবং অন্যান্য সামাজিক প্রকল্পে যদি একই ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে ক্ষোভের পরিধি আরও বাড়তে পারে।

কারণ প্রথম কয়েক মাস সাধারণত নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিক ‘মধুচন্দ্রিমা’ সময়। সেই সময়েই যদি কোনও জনপ্রিয় প্রকল্পকে ঘিরে এত দ্রুত অসন্তোষ তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

তবে উল্টো ছবিও রয়েছে।

যদি সরকার দ্রুত বাতিল আবেদনগুলি পুনর্বিবেচনা করে, ভুল যাচাই সংশোধন করে এবং যোগ্য মহিলাদের নিয়মিত সময়ে ৩,০০০ টাকা পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে আজকের ক্ষোভই আগামী দিনে সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক সাফল্যের গল্পে পরিণত হতে পারে।

শেষ কথা: ভোটের বাক্সে কতটা প্রতিফলন?

এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে অন্নপূর্ণা যোজনাকে ঘিরে বর্তমান ক্ষোভ আগামী নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে পরিণত হবে। ভোটের সিদ্ধান্তে স্থানীয় প্রার্থী, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ—সবকিছুর ভূমিকা থাকে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—

মহিলাদের হাতে সরাসরি টাকা পৌঁছে দেওয়া এখন আর শুধুমাত্র কল্যাণমূলক প্রকল্প নয়; বাংলার রাজনীতিতে এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক চুক্তি।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সেই চুক্তির সূচনা করেছিল। বিজেপি অন্নপূর্ণা যোজনার মাধ্যমে সেই চুক্তির অঙ্ক বাড়িয়েছে। এখন পরীক্ষাটা সরকারের—৩,০০০ টাকার প্রতিশ্রুতি কতটা নির্ভুলভাবে বাস্তবে পৌঁছয়।

কারণ ভোটার হয়তো সরকারের বাজেটের হিসাব মনে রাখবেন না, প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তির ভাষাও মনে রাখবেন না। কিন্তু মাসের শেষে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকল কি না—সেটা খুব সহজেই মনে থাকবে।

আর সেই স্মৃতিই আগামী দিনের বাংলার ভোটের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ‘এম ভিটামিন’ হয়ে উঠতে পারে।