TMCP’s Public Meeting and Legal Conflict
নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা, ২৯ আগস্ট: কলকাতার ক্যাথেড্রাল রোডে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP) প্রতিষ্ঠা দিবসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একটি স্বতঃপ্রণোদিত (suo motu) এফআইআর (FIR) দায়ের করেছে কলকাতা পুলিশ।এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর। একদিকে পুলিশের দাবি, আদালত নির্ধারিত শর্তাবলি লঙ্ঘন করা হয়েছে; অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য— কর্মসূচিতে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও তিনি স্বয়ং যানজট মুক্ত করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশ ও পুলিশের পদক্ষেপ
এই ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বিজেপি নেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে পুলিশকে এফআইআর করার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু অধিকারী প্রশ্ন তোলেন, “প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করলেন?” তিনি অভিযোগ করেন, আদালত রাস্তার একটি লেন খোলা রেখে সভা করার অনুমতি দিয়েছিল, কিন্তু পুরো রাস্তাটিই অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন:“আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল রাস্তার একপাশ ফাঁকা রেখে সভা করতে হবে। কিন্তু তিনি গাছের তলায় থাকা মানুষদের ডেকে এনে পুরো রাস্তা বন্ধ করে দিলেন—এটা কী ধরনের আচরণ? আমি পুলিশকে বলেছি তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে এবং হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
শুভেন্দু অধিকারীর এই বিবৃতির পর দক্ষিণ কলকাতার হেস্টিংস থানায় এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) একাধিক ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, সরকারি আদেশ অমান্য করা, সরকারি কাজে বাধা দান এবং জনপথে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি বা পথ অবরোধের মতো অভিযোগ।
ঘটনাপ্রবাহ ও পরিস্থিতির জটিলতা
হাইকোর্টের অনুমতি অনুযায়ী, ক্যাথেড্রাল রোডে দুপুর ১২টা থেকে ৩টের মধ্যে সভা সম্পন্ন করার এবং রাস্তার একটি লেন যান চলাচলের জন্য খোলা রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সভাস্থলে বিপুল জনসমাগম হওয়ায় ক্যাথেড্রাল রোডের উভয় পাশেই যান চলাচল ব্যাহত হয় বলে পুলিশের দাবি।তবে সভার ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টির অন্য একটি দিকও সামনে আসে। সভাস্থলে হঠাৎ যানবাহন ঢুকে পড়লে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিজেই উদ্যোগী হন। তিনি মঞ্চ থেকেই বক্তব্য থামিয়ে যানবাহনগুলোকে নিরাপদে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন:“আমাদের কর্মীরা আপনাদের সাহায্য করবে। যে গাড়িগুলো ভেতরে ঢুকে পড়েছে, সেগুলোকে আগে বের করে দিন। কারোর যেন কোনো অসুবিধা না হয়।”
একই সাথে কেন পুলিশ সময়মতো গাড়িগুলো সরাচ্ছে না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। ফলে কেবল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাস্তা বন্ধ করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁর এই পদক্ষেপ সেই দাবিকে কিছুটা জটিল করে তোলে।
রাজনৈতিক সংঘাত ও পাল্টা অভিযোগ
এই কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে শুভেন্দু অধিকারী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বন্দ্বে আরও ধার এসেছে। ক্যাথেড্রাল রোডের মঞ্চ থেকেই রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের অনুমতি না পাওয়া নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের সমালোচনা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য সহজে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না এবং বারবার আদালতের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়:“এখন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না, আইনি পথ ধরে অনুমতি আনতে হচ্ছে। এর পর থেকে পুলিশ অনুমতি না দিলে আমরা জনগণের অনুমতি নিয়েই কর্মসূচি পালন করব।”
জনসমাগম ও শক্তির মহড়া
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সভার উপস্থিতি দুই শিবিরের শক্তির মহড়া হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে টানাটানির আবহেই এই সমাবেশ আয়োজিত হয়েছিল। রানী রাসমণি এভিনিউ ও বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত পৃথক কর্মসূচিগুলোর মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যাথেড্রাল রোডের সভায় কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।একদিকে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দল যেখানে আইনি শর্তভঙ্গকে মূল ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে তৃণমূলের সমর্থকরা বিপুল জনসমাগমকে তাদের নেত্রীর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দাবি করছেন।
আইনি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
রাস্তার অবরুদ্ধতা কিংবা আইনি শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি এখন তথ্যের প্রমাণের ওপর নির্ভর করছে। একটি বড় মাপের রাজনৈতিক সমাবেশে আকস্মিক যানজট বা ভিড় নিয়ন্ত্রণের জটিলতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়; সেই পরিস্থিতিতে মঞ্চ থেকে গাড়ি সরানোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া নির্দেশও তদন্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে।সব মিলিয়ে, ক্যাথেড্রাল রোডের এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি ট্রাফিক বা নিয়মভঙ্গের বিষয় হয়ে থাকেনি; এফআইআর দায়েরের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক লড়াইয়ে এখন একটি নতুন আইনি মাত্রা যোগ হয়েছে।
