উজ্জয়িনীতে শাহী মসজিদ ভাঙা কেন্দ্র করে উত্তেজনা: কাজির বার্তায় পরিস্থিতির উন্নতি

Tension in Ujjain over the demolition of a Shahi Masjid.

নিজস্ব প্রতিবেদন

উজ্জয়িনী: ২০২৮ সালের আসন্ন সিংহস্থ (Simhastha) মেলা উপলক্ষে ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নত ও সুগম করতে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে শুরু হয়েছে রাস্তা চওড়া করার মেগা প্রজেক্ট। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে গোপাল মন্দির ও ছত্রপতি চকের (ছত্র চৌক) নিকটবর্তী শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ-এর একটি অংশ ভাঙা নিয়ে সোমবার সকালে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও আধাসেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

১. বর্তমান পরিস্থিতি ও পুলিশের পদক্ষেপ

প্রশাসনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হওয়ার পর মসজিদ কমিটির সদস্যরা প্রাথমিকভাবে নিজ দায়িত্বেই ভাঙার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এলাকায় হঠাৎ কিছু অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির তরফ থেকে পাথর ছোঁড়ার ঘটনা ঘটে। এই আকস্মিক উপদ্রবে পরিস্থিতি রণক্ষেত্রের রূপ নিলে পুলিশ বাধ্য হয়ে টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটে এবং জনতা ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে মহিলা বিক্ষোভকারীরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। মহিলা পুলিশকর্মীরা তাঁদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার সময় টানাপোড়েনে উজ্জয়িনী ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইনচার্জ তথা ইন্সপেক্টর পুষ্পা পাঞ্চালের হাতে আঘাত লাগে। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে থাকা মহিলারা একটি চাদর বা ত্রিপলের আড়ালে এগোচ্ছিলেন, এবং সেই চাদরের ধারেই ইন্সপেক্টরের হাত কেটে যায়। তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পুলিশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে কোনো মহিলা আহত হননি এবং প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন তৎক্ষণাৎ এলাকায় প্রায় ২,০০০ পুলিশ কর্মী মোতায়েন করেছে। মসজিদের চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আনুমানিক ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ব্যারিকেড ও কঠোর চলাচল নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শীর্ষ স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন।

২. শহরের কাজির বিশেষ বার্তা ও গুজব থেকে দূরে থাকার আবেদন

পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, ঠিক সেই সময়ে উজ্জয়িনী শহরের কাজী খলিলুর রহমান (Qazi Khali Kurre Rehman) একটি ভিডিও বার্তা জারি করে সাধারণ মানুষকে কোনো ধরনের ভুয়ো খবর বা গুজবে কান না দেওয়ার কড়া আবেদন জানান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, রাতের মধ্যেই পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে মসজিদের বিষয়টি সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সমাধান হয়ে গেছে।

কাজী সাহেব তাঁর বার্তায় বলেন, “মসজিদ সংক্রান্ত বিষয়টি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই রাতেই মীমাংসা হয়ে গেছে। এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যার জন্য কাউকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। যে কাজটি সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে সেই কাজটিই নিয়মমাফিক চলছে। সকলের কাছে অনুরোধ, কোনো রকম গুজবে কান দেবেন না এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে গুজব শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে ঘটনাস্থলে ভিড় করবেন না।” তাঁর এই সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল বার্তার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফেরে।

৩. রাস্তা চওড়া করার মূল কারণ ও প্রজেক্টের বিবরণ

২০২৮ সালের ঐতিহাসিক সিংহস্থ (মহাকুম্ভ) মেলার কথা মাথায় রেখে উজ্জয়িনীর পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, কানথাল চৌরাহা থেকে গোপাল মন্দির পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মিটার লম্বা রাস্তাটি ১৫ মিটার চওড়া করা হচ্ছে। বিখ্যাত মহাকালেশ্বর মন্দির এবং পবিত্র ক্ষিপ্ৰা নদীর অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ার কারণে এই চত্বরে সারা বছরই প্রচুর ভক্ত ও পর্যটকদের সমাগম ঘটে। মেলার দিনগুলিতে তীব্র যানজট এড়ানো এবং জনস্রোত নির্বিغ্নে নিয়ন্ত্রণ করতেই এই রাস্তা চওড়া করার কাজ অত্যন্ত জরুরি বলে প্রশাসনের দাবি। এই প্রজেক্টের আওতায় রাস্তার ধারে থাকা অন্যান্য অবৈধ বা বাধাপ্রাপ্ত কাঠামো ইতিমধ্যেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে, আর শাহী মসজিদটিই বর্তমানে এই অপসারণ প্রক্রিয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

৪. মসজিদের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও মালিকানা

উজ্জয়িনীর এই শাহী মসজিদটি ১০০ বছরেরও বেশি পুরানো একটি ঐতিহাসিক ইমারত। মসজিদ ম্যানেজমেন্ট কমিটির পেশ করা নথি অনুযায়ী, ১৯২৫ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন সিন্ধিয়া রাজবংশের আমলের একটি দলিলে এই মসজিদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছিল যে জমি অধিগ্রহণের পরও মসজিদের বাকি অংশ অক্ষত রাখা হবে।

এছাড়াও, ১৯৭৫ সালে ট্রাফিক ও জনসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে মসজিদ কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় তাদের কিছু জমি ছেড়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫ সালের মধ্যপ্রদেশ সরকারের অফিসিয়াল গেজেটেও এই মসজিদের পরিমাপ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের দাবি, এটি একটি রেজিস্টার্ড ওয়াকফ সম্পত্তি এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় নিদর্শন হওয়ায় এর সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

৫. মুসলিম সমাজের প্রতিবাদ ও আইনি লড়াই

মসজিদ কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বক্তব্য হলো—প্রশাসন চাইলে বিকল্প কোনো উপায়ে বা অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন করে রাস্তা চওড়া করতে পারত, কিংবা মসজিদের বিপরীত দিকের কাঠামো ভেঙেও এই কাজ চালানো সম্ভব ছিল। ঐতিহাসিক ধর্মীয় কাঠামো রক্ষার দাবিতে তারা দীর্ঘআইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই আইনি লড়াইয়ের অংশ হিসেবে, মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ গত ৯ সেপ্টেম্বর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি পিটিশন খারিজ করে দেয়। আদালতের রায়ে স্পষ্ট জানানো হয় যে, এই অপসারণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সমস্ত আইনি ও বিধিবদ্ধ পদ্ধতি যথাযথভাবে মেনে চলেছে এবং এটি সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ বা ৩০০এ ধারা লঙ্ঘন করে না। বিশেষ করে সিংহস্থ মেলার ট্রাফিক গুরুত্ব এবং মহাকালেশ্বর মন্দিরের সান্নিধ্যের কথা মাথায় রেখেই আদালত এই রায় দেয়। বর্তমানে এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে মসজিদ কমিটি একটি ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছে।