Prime accused in Gaighata rape-murder case killed in police firing
বৈদ্যবাড়ির কাছে গাড়ি থামিয়ে পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ | অভিযুক্তের তিন রাউন্ড গুলির জবাবে পুলিশের চার রাউন্ড গুলি | চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে মৃত্যু প্রহ্লাদ দাসের | খুশি নিহত কিশোরীর পরিবার
নিজস্ব প্রতিবেদন
বনগাঁ: একাদশ শ্রেণির কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলার মূল অভিযুক্তের মৃত্যু হল পুলিশের গুলিতে। সোমবার গভীর রাতে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় অপরাধস্থল পুনর্নির্মাণের পর ফেরার পথে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মৃত্যু হয় ২৩ বছরের প্রহ্লাদ দাসের। পুলিশের প্রাথমিক দাবি, কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পর পর তিন রাউন্ড গুলি চালায় অভিযুক্ত। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও চার রাউন্ড গুলি চালায়। তাতে একটি গুলি লাগে প্রহ্লাদের শরীরে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
গত চার মাসে রাজ্যে একই ধরনের দ্বিতীয় এনকাউন্টারের ঘটনা সামনে এল। এর আগে গত ৮ জুলাই দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ধর্ষণ ও খুনের মামলার মূল অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল পুলিশের গুলিতে। পরপর দু’টি ঘটনায় অপরাধস্থল পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনা পুলিশের ভূমিকা এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
বৈদ্যবাড়ির কাছে কী ঘটেছিল?
প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, সোমবার রাত ১২টার কিছু আগে ধর্ষণ ও খুনের মামলার অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে যায় পুলিশ। গাইঘাটার ঘটনাস্থল থেকে বাংলাদেশ সীমান্তের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার।
পুলিশ সূত্রের দাবি, অপরাধস্থল পুনর্নির্মাণের পর অভিযুক্তকে নিয়ে গাড়িতে করে ফিরছিলেন পুলিশকর্মীরা। সেই সময় বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে প্রস্রাব করার জন্য গাড়ি থামাতে অনুরোধ করে প্রহ্লাদ। গাড়ি থামার পরেই কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নেয় সে।
অভিযোগ, এরপর পর পর তিন রাউন্ড গুলি চালায় অভিযুক্ত। তার মধ্যে একটি গুলি পুলিশের গাড়িতে লাগে। আকস্মিক এই ঘটনায় প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন পুলিশকর্মীরা। একজন পুলিশকর্মী জখম হন। অন্য এক পুলিশকর্মী রাস্তার পাশের জলাশয়ে ঝাঁপ দেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আত্মরক্ষার্থে চার রাউন্ড গুলি চালান পুলিশকর্মীরা। তার মধ্যে একটি গুলি লাগে প্রহ্লাদের শরীরে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। জখম পুলিশকর্মীরও হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়।
তবে এই ঘটনার বিষয়ে পুলিশের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে গুলিচালনার সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ এবং পুলিশের বক্তব্যের বিস্তারিত বিবরণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
ঘটনাস্থলে পুলিশি ব্যারিকেড, পড়ে জুতো
মঙ্গলবার সকালে বৈদ্যবাড়ির ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা যায়, রাস্তার ওই অংশটি ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে একটি জুতোও পড়ে থাকতে দেখা যায়। তবে সেটি কার, তা এখনও স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, মৃত অভিযুক্তের বাড়ির দিকে এবং নিহত কিশোরীর বাড়ির দিকেও বাইরের লোকেদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশ। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন।
কীভাবে সামনে এসেছিল ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা?
রবিবার (২৫ অক্টোবর) উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় একাদশ শ্রেণির এক কিশোরীর দেহ উদ্ধার হয় প্রতিবেশীর বাড়ির পিছন থেকে। আগের দিন থেকেই নিখোঁজ ছিল ওই কিশোরী। দেহ উদ্ধারের পর ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনার তদন্তে নেমে ওই দিনই প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আদালতে পেশ করার পর তাকে ১০ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়। মামলার তদন্তের জন্য গঠন করা হয় বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)। তদন্তের অংশ হিসেবেই অভিযুক্তকে নিয়ে অপরাধস্থল পুনর্নির্মাণ করতে গিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু সেই পুনর্নির্মাণের পর ফেরার পথেই অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসায় তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
নিহত কিশোরীর পরিবারের প্রতিক্রিয়া
পুলিশি এনকাউন্টারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গাইঘাটার স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে সন্তোষ দেখা গিয়েছে। খুশি নিহত কিশোরীর পরিবারও।
কিশোরীর বাবা বলেন, “আমার মেয়েকে তো আর ফেরত পাব না। সরকারের নির্দেশে পুলিশ ভাল করেছে। অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করেছিল। পুলিশকে গুলি চালিয়েছিল। পুলিশের পাল্টা গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।” মেয়েকে হারানোর যন্ত্রণা যে কোনওভাবেই পূরণ হওয়ার নয়, তা স্পষ্ট তাঁর কথায়। তবে অভিযুক্তের মৃত্যুর খবরকে স্বস্তি হিসেবেই দেখছে পরিবার।
চার মাস আগে বারুইপুরেও একই ঘটনা
গাইঘাটার ঘটনার সঙ্গে গত ৮ জুলাই দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের ঘটনার মিল রয়েছে।
বারুইপুরে ৫ জুলাই ১২ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ সামনে আসে। পরে একটি পুকুর থেকে তার দেহ উদ্ধার করা হয়। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়।
তদন্তে নেমে মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৮ জুলাই ভোররাতে অপরাধস্থল পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পুলিশের দাবি ছিল, সেই সময় অভিযুক্তের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয় এবং পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু হয়।
বারুইপুরের ঘটনার পরও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলি ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছিল।
এবার গাইঘাটায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় সেই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
এনকাউন্টার, তদন্ত ও বিচার—প্রশ্ন একাধিক
ধর্ষণ ও খুনের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্তের মৃত্যু কীভাবে ঘটল, তা নিয়েও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, অভিযুক্ত আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়েছিল। কিন্তু সেই দাবি যাচাই করতে হলে ঘটনাস্থলের ফরেনসিক পরীক্ষা, ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষা, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে, অপরাধস্থল পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্তের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছনোর পরিস্থিতি এবং পুলিশের গুলিচালনার প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
এক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে—
- অভিযুক্তকে অপরাধস্থলে নিয়ে যাওয়ার সময় নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা ছিল?
- পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা কীভাবে ঘটল?
- অভিযুক্তের গুলিচালনার দাবির পক্ষে কী কী প্রমাণ রয়েছে?
- পুলিশের গুলিচালনা আত্মরক্ষার্থে হয়েছিল কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
- বারুইপুরের ঘটনার মতো গাইঘাটার ঘটনাতেও কি স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠবে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া গেলে তবেই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।
নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে কোন পথে প্রশাসন?
গাইঘাটার ঘটনায় একদিকে রয়েছে এক কিশোরীর ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্তের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু। দুই ঘটনাই অত্যন্ত গুরুতর এবং দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
অভিযুক্তের মৃত্যুতে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তদন্তে সংগৃহীত প্রমাণের কী হবে এবং ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের ভূমিকা কীভাবে সামনে আসবে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
নারী নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা, অপরাধের তদন্তে কোনও ফাঁক না রাখা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
গাইঘাটার ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যই শেষ কথা কি না, নাকি তদন্তে উঠে আসবে অন্য কোনও তথ্য—এখন সেদিকেই নজর।
