ব্যবস্থা বদলের জিগির নাকি তারুণ্যের ভয়ের রাজনীতি? উত্তরপ্রদেশের নতুন ফরমান নিয়ে তুঙ্গে বিতর্ক

New rule in Uttar Pradesh: Protesters seeking ‘systemic change’ will be ineligible for government jobs

বিশেষ প্রতিবেদন

লখনউ: গণতন্ত্রে সরকার বদলায় ভোটের বাক্সে, কিন্তু সেই সরকার টিকিয়ে রাখতে কি এবার মতাদর্শের স্বাধীনতাকেই কাঠগড়ায় তুলছে লখনউ? উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের সাম্প্রতিক এক নির্দেশিকা ঘিরে এই মুহূর্তে গোটা দেশজুড়ে শুরু হয়েছে জোরদার রাজনৈতিক বিতর্ক। রাজ্য সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, হিংসাত্মক পদ্ধতিতে বর্তমান রাজনৈতিক বা সামাজিক ‘ব্যবস্থা পরিবর্তনের’ উদ্দেশ্যে কাজ করে—এমন কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত প্রার্থীরা আর পাবেন না সরকারি চাকরি।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই ‘ব্যবস্থা বদল’ বা ‘অপারেশনাল সিস্টেমেটিক চেঞ্জ’-এর সংজ্ঞার আড়ালে কি আসলে কোপ পড়তে চলেছে তরুণ প্রজন্মের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারে? দ্য হিন্দু-র প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তরপ্রদেশ সরকারের নিয়োগ ও কর্মিবর্গ দফতরের প্রধান সচিব এম দেবরাজের জারি করা এই নির্দেশিকা কেবল রাজ্য সরকারের দফতর নয়, বরং সরকারি নিগম, বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের চাকরির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।

সরকারের দাবি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হবে না। কিন্তু নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, ২১ বছর বয়স পার করার পর চরিত্র যাচাইয়ের আগের তিন বছরের মধ্যে কেউ যদি এমন কোনো কার্যকলাপে যুক্ত থাকেন, তবে ধরে নেওয়া হবে তাঁর সেই সংযোগ এখনও বহাল রয়েছে। অর্থাৎ, অতীতে কোনো আন্দোলনে সামিল হওয়া মানেই চাকরি পাওয়ার পথে বিশাল এক প্রশ্নচিহ্ন। স্বাভাবিকভাবেই এই নিয়মের কড়া সমালোচনা করে দ্য হিন্দু-র রিপোর্টে উঠে এসেছে বিরোধীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

সমাজবাদী পার্টির মুখপাত্র আশুতোষ বর্মা সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে বলেছেন, “এগুলি একটি ভীত সরকারের নিয়ম। ক্ষমতার পরিবর্তন আর ব্যবস্থার পরিবর্তন এক বিষয় নয়।” অন্যদিকে, কংগ্রেস মুখপাত্র সুরেন্দ্র রাজপুত সতর্ক করে জানিয়েছেন, যুবকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, ধর্না কিংবা প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে জোর করে হিংসাত্মক কার্যকলাপ হিসেবে দেগে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশের প্রশ্ন, দেশজুড়ে বর্তমান জেন জি (Gen-Z) আন্দোলনের গতি ও তরুণ সমাজের ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদের সাফল্যকেই কি তবে ভয় পাচ্ছে যোগী প্রশাসন? কারণ ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে রাজ্য থেকে জাতীয় রাজনীতি—কংগ্রেস বা বিজেপি, সব প্রধান দলেরই নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে কোনো না কোনো ছাত্র ও গণআন্দোলনের হাত ধরেই। আগামী বছরই উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। তার ঠিক আগে তরুণ প্রজন্মের এই স্বাধীন ও প্রতিবাদী মানসিকতায় রাশ টানতেই কি এই দীর্ঘমেহাদী কৌশল নিয়েছে শাসকদল?

দ্য হিন্দু-র বিশ্লেষণে স্পষ্ট, আইনের দৃষ্টিতে এফআইআর বা পুলিশি তদন্তকে সরাসরি অযোগ্যতার কারণ না বলা হলেও, চরিত্র যাচাইয়ের এই কঠোর বর্ম আদতে বেকার যুবক-যুবতীদের মনে এক ধরণের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করবে। বিজেপি সাংসদ রাম প্রতাপ সিং অবশ্য এই পদক্ষেপের সমর্থনে বলেছেন, “যাঁরা অরাজকতা ছড়ান, তাঁদের সঙ্গে এভাবেই মোকাবিলা করা উচিত।”

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আর হিংসার সূক্ষ্ম রেখাটিকে প্রশাসন কীভাবে আলাদা করবে? উত্তরপ্রদেশের এই নয়া নির্দেশিকা কি শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা, নাকি আগামী দিনের রাজনৈতিক কণ্ঠরোধের এক সুদূরপ্রসারী ব্লু-প্রিন্ট—তা সময় বলবে। তবে এর জেরে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সরকারি চাকরির চরিত্র যাচাইয়ের সীমারেখা নিয়ে দেশজুড়ে যে নতুন বিতর্কের আগুন জ্বলল, তা সহজে নেভার নয়।