Bangladesh’s reaction to the announcement of Sheikh Hasina’s return to the country.
ঢাকা: দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো সরাসরি দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি নির্দিষ্ট করে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে শেখ হাসিনার এই ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল তাঁকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে এখনই দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বিএনপি ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্র নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতেই হবে—তবে তা রাজনীতিতে পুনর্বাসনের জন্য নয়, বরং আদালতে ফাঁসির রায় কার্যকর করার জন্য।
রয়টার্সকে দেওয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার
গত বৃহস্পতিবার রাতে রয়টার্সকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি মৃত্যুই আসে, আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই মৃত্যু হোক—যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছিল।”
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যার মূল দায় শেখ হাসিনা সরকারের ওপর বর্তায়।
আইন উপদেষ্টা ও সরকারের প্রতিক্রিয়া
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “স্বাগতম, শেখ হাসিনা। অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারও একই উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে চায়। যদি আপনার দেশে ফেরার আগ্রহ সত্য হয়, তাহলে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা কেন? শেখ হাসিনা, আপনি এখনই দেশে ফিরে আসুন।”
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সংবাদমাধ্যমকে জানান, শেখ হাসিনার পুরো বিষয়টি আইনের আওতায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে তাঁর বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং দেশের গণমাধ্যম তা বজায় রাখবে। তিনি শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে ‘নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী বিষয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, সরকার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ আইনি দৃষ্টিতেই দেখছে।
বিএনপি ও ছাত্র নেতাদের কঠোর হুঁশিয়ারি
জুলাই আন্দোলনের শীর্ষ নেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শুক্রবার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশ অলরেডি ১৬ বছরের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এখন আমরাও চাই তিনি দেশে ফিরবেন, তবে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য।”
একই সুর শোনা গেছে বিএনপি নেতাদের কণ্ঠেও। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের একটি মামলায় বিচার শেষে ঢাকায় আদালতে ফাঁসির রায় হয়েছে। আরও অনেক হত্যা মামলায় তাঁর বিচার চলছে। তাঁর অপরাধের ব্যাপারে আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, শেখ হাসিনাসহ পলাতক স্বৈরাচারীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে। ১৭ কোটি মানুষের সামনে তাদের সাজা কার্যকর করা হবে।
রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও বিচারপ্রক্রিয়া
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিহ্ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ক্ষমতাচ্যুত শক্তির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা ও দেশে ফেরার ঘোষণাকে ‘রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “গণ–অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অপরাধের বিচার কেবল দায়ীদের শাস্তির জন্য নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্যও জরুরি। এই বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে সমাজে ক্ষোভ ও অস্থিরতা জমতে থাকবে।”
