G.D. Agarwal’s 111-day fast and death for the protection of the Ganges.
বিশেষ প্রতিবেদন :
নদীর কোনো রাজনৈতিক সীমানা থাকে না, কিন্তু নদীর একটি নিয়তি থাকে। বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে, যে নদী কোটি কোটি মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনা, সংস্কৃতি এবং জীবিকার মেরুদণ্ড, তার নিয়তি ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কিন্তু আজ সেই গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত গঙ্গা বা ‘মা গঙ্গা’ এক তীব্র অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। আর এই সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েই ২০১৮ সালের ১১ই অক্টোবর ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবিজ্ঞানী, আইআইটি কানপুরের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং পরবর্তীকালে হিন্দু সন্ন্যাসী রূপান্তর নেওয়া অধ্যাপক জি ডি আগরওয়াল (স্বামী জ্ঞান স্বরূপ সানন্দ) তাঁর জীবন উৎসর্গ করেন। টানা ১১১ দিনের এক দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক অনশনের পর ৮৬ বছর বয়সে তাঁর এই মহাপ্রয়াণ কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়, বরং তা ভারতের পরিবেশ আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি এবং প্রকৃতির প্রতি আমাদের সামগ্রিক উদাসীনতার এক জীবন্ত দলিল।
সম্প্রতি জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলন যখন পুনরায় জাতীয় স্তরে পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলোকে সামনে এনেছে, তখন জি ডি আগরওয়ালের সেই আত্মত্যাগ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এটি আমাদের বাধ্য করে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে: আমরা কি প্রগতির নামে প্রকৃতির ফুসফুসকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিচ্ছি?
বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন: কে ছিলেন এই অনন্য প্রতিবাদী?
অধ্যাপক জি ডি আগরওয়াল কোনো সাধারণ আন্দোলনকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে-র প্রাক্তন গবেষক এবং ভারতের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের (CPCB) প্রথম প্রধান। আইআইটি কানপুরে পরিবেশ প্রকৌশল (Environmental Engineering) পড়ানোর সময় তিনি বহু শিক্ষার্থীকে প্রকৃতির বিজ্ঞান বুঝিয়েছেন। ২০১১ সালে তিনি যখন সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করে ‘স্বামী জ্ঞান স্বরূপ সানন্দ’ নাম নেন, তখন তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক চেতনার সাথে যুক্ত হয়েছিল নদীর প্রতি এক গভীর আধ্যাত্মিক দায়বদ্ধতা।
তিনি জানতেন, গঙ্গাকে বাঁচাতে হলে কেবল উপরিভাগের আবর্জনা পরিষ্কার করলে চলবে না, প্রয়োজন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বা ‘অবিচ্ছিন্ন ধারা’ (Aviral Dhara) ফিরিয়ে আনা। বিজ্ঞান ও সনাতন আধ্যাত্মিকতার এই মেলবন্ধনই তাঁকে আপসহীন লড়াইয়ের শক্তি জুগিয়েছিল।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বনাম নির্মম বাস্তবতা
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারাণসীর গঙ্গা ঘাট থেকে আবেগঘন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “মুঝে মা গঙ্গা নে বুলায়া হ্যায়” (আমাকে মা গঙ্গা ডেকেছেন)। এই একটি বাক্য কোটি কোটি ভারতবাসীর মনে আশার আলো জ্বালিয়েছিল যে, এবার হয়তো গঙ্গার ভাগ্য ফিরবে। গঠিত হয়েছিল ‘নমামি গঙ্গে’র মতো মেগা প্রকল্প, বরাদ্দ হয়েছিল হাজার হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধ্যাপক আগরওয়াল তাঁর মৃত্যুর ঠিক কয়েক মাস আগে, আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রীকে লেখা একটি অত্যন্ত কঠোর ও তীক্ষ্ণ চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন:
“গত ৪ বছরে আপনার সরকারের নেওয়া কোনো পদক্ষেপই গঙ্গার জন্য লাভজনক প্রমাণিত হয়নি। গঙ্গার পরিবর্তে কেবল কর্পোরেট সেক্টর এবং বেশ কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মুনাফাই দৃশ্যমান হয়েছে।”
এই বক্তব্যটি কোনো রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ছিল না, এটি ছিল একজন বিজ্ঞানীর তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ। সরকারের প্রকল্পগুলো মূলত নদী পরিষ্কারের যান্ত্রিক প্রক্রিয়া বা ঘাট সৌন্দর্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গঙ্গার মূল সমস্যা—নদীর উজানে অসংখ্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধের কারণে জলের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অবাধে বালু উত্তোলন বা খনিজ খনন—সেগুলোকে স্পর্শই করা হয়নি।
অনশন এবং রাষ্ট্রের নীরবতা: একটি ট্র্যাজেডির ইতিহাস
২০১৮ সালের ২২শে জুন জি ডি আগরওয়াল তাঁর মহাত্মা গান্ধী-শৈলীর অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। তাঁর দাবিগুলো ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত:
- গঙ্গা ও তার উপনদীগুলোর ওপর সমস্ত নির্মাণাধীন ও প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করতে হবে।
- নদীর তলদেশ থেকে অবৈধ বালু ও পাথর খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
- গঙ্গার সুরক্ষার জন্য একটি স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠন করতে হবে।
- সর্বোপরি, গঙ্গা নদী সুরক্ষার জন্য একটি কঠোর আইন (Ganga Protection Act) পাস করতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষী, এর আগে ২০০৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে আগরওয়াল যখন অনশন করেছিলেন, তখন সরকার সংবেদনশীলতা দেখিয়েছিল। ভাগীরথী নদীর ওপর একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছিল এবং সেই অঞ্চলটিকে ‘পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল’ (Eco-sensitive zone) ঘোষণা করা হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালের পরিবেশ ছিল ভিন্ন। অধ্যাপক আগরওয়ালের একের পর এক চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। দীর্ঘ অনশনের পর যখন তিনি মধু ও জল খাওয়াও বন্ধ করে দেন, তখন ১০ই অক্টোবর পুলিশ তাঁকে জোরপূর্বক ঋষিকেশের এইমস (AIIMS)-এ নিয়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরের দিনই এই মহান আত্মা বিদায় নেন।
তাঁর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা এবং সরকারি মুখপাত্রদের “দাবি পূরণ করা হয়েছে” এমন দাবিকে পরিবেশকর্মীরা চূড়ান্ত ভণ্ডামি এবং নির্মম পরিহাস বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, গঙ্গার জল আজও তার অধিকার ফিরে পায়নি।
গঙ্গার বর্তমান অবস্থা: প্রগতির নামে আত্মহনন
পরিবেশবিদদের মতে, ২০১৪ সালের তুলনায় বর্তমানে গঙ্গার অবস্থা আরও শোচনীয়। নদীকে কেবল একটি তরল পদার্থের পরিবাহক হিসেবে দেখলে চলবে না; নদী একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem)।
১. জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মরণফাঁদ: আলকানন্দা এবং ভাগীরথীর মতো উৎস স্রোতগুলোর ওপর একের পর এক বাঁধ দেওয়ার ফলে নদীর স্বাভাবিক বেগ হারিয়ে গেছে। বাঁধের জলাধারে জল আটকে থাকার কারণে নদীর জলকে পুনরুজ্জীবিত করার যে প্রাকৃতিক ক্ষমতা (Self-purifying capacity), তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ২. নগরায়ন ও বর্জ্য নিষ্কাশন: নদী তীরবর্তী শত শত শহর ও হাজার হাজার গ্রামের কোটি কোটি লিটার অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্য (Sewage) এবং বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য প্রতিদিন গঙ্গায় মিশছে। ৩. জল প্রত্যাহার: কৃষিকাজ ও শিল্পায়নের জন্য নদীর জল এত বিপুল পরিমাণে তুলে নেওয়া হচ্ছে যে, শুষ্ক মরসুমে অনেক জায়গায় নদীটি একটি সরু নালায় পরিণত হয়।
আগরওয়ালের উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পথ
অধ্যাপক জি ডি আগরওয়ালের মৃত্যু আমাদের সামনে এক বিশাল শূন্যতা এবং একই সাথে এক গুরুদায়িত্ব রেখে গেছে। ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে প্রগতি বা পরিকাঠামো উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যদি প্রকৃতির মূল ভিত্তি ধ্বংস করে হয়, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।
পরিবেশবিদ হিমাংশু ঠাক্করের মতে, গঙ্গা রক্ষার জন্য সরকারকে কর্পোরেট-বান্ধব নীতি থেকে সরে এসে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। আরও বেশি পরিবেশ-বান্ধব পয়ঃনিষ্কাশন প্ল্যান্ট (Eco-friendly Sewage Treatment Plants) তৈরি করা এবং নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহকে অক্ষুণ্ণ রাখাই এর একমাত্র বৈজ্ঞানিক সমাধান।
