নিরাপত্তা বনাম ঐতিহ্য: কলকাতা বিমানবন্দরে ১৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদে নামাজ বন্ধ

Prayers halted at 136-year-old mosque at Kolkata Airport.

কলকাতা: আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা বিধির জের। কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–সংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত ১৩৬ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদে’ নামাজ আদায় আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শুক্রবার এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নামাজ পড়ার চেষ্টা করা হলে কর্তৃপক্ষের বাধাদানের মুখে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সকাল থেকেই বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেট ও আশপাশের এলাকায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৬৩ ধারা (সাবেক ১৪৪ ধারা) জারি করা হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী।

নিরাপত্তার চাদরে বিমানবন্দর এলাকা, জারি ১৬৩ ধারা

শুক্রবার সপ্তাহের পবিত্র দিন হওয়ায় মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিধাননগর পুলিশ গোটা এলাকা ঘিরে রেখেছে।

সকাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, রাপিড অ্যাকশন ফোর্স এবং জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে এই স্তরের বড় মাপের কোনো মসজিদে নামাজ বন্ধের ঘটনা ঘটল।

বিরোধের মূল কারণ: আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা বিধি

সম্প্রতি এক বিবৃতিতে কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা বিধি (International Aviation Safety Norms) অনুযায়ী, বিমান ওঠানামার পথ বা রানওয়ে থেকে যেকোনো ধরনের অবকাঠামোর দূরত্ব ন্যূনতম ২৪০ মিটার থাকা বাধ্যতামূলক।

“বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদটি বর্তমানে রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে অবস্থিত। ফলে রানওয়ের নির্ধারিত নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে এটি চলে আসায় বিমান ও যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই মসজিদটি স্থানান্তরিত করা প্রয়োজন।” — কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ

বিমানবন্দরের যে অঞ্চলটি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত, মসজিদটি ঠিক তার ভেতরেই পড়েছে। ভারতের সমস্ত সরকারি ও কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনী ‘সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স’ (CISF)-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে এই অঞ্চলটি। সিআইএসএফ-ও অতীতে রানওয়ের এত কাছাকাছি এই ধর্মীয় স্থাপনার অবস্থান নিয়ে একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছিল।

আকস্মিক সিদ্ধান্ত? ক্ষুব্ধ মসজিদ কমিটি

মসজিদ স্থানান্তরের এই আকস্মিক পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। তাদের অভিযোগ, মসজিদটি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ সেখানে যাতায়াত ও নামাজ আদায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ জমিরউদ্দিন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের আগে থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়নি। হঠাৎ করে নামাজ বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা স্তম্ভিত।”

তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগের বিপরীতে জানিয়েছে যে, মসজিদটি স্থানান্তরের বিষয়ে মসজিদ কমিটির সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। অতীতেও কমিটিকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, বর্তমান অবস্থান থেকে সরিয়ে অন্য একটি সুবিধাজনক ও প্রশস্ত জায়গায় মসজিদটির জন্য জমি দেওয়া হবে।

বিমানবন্দর তৈরির ৩৪ বছর আগের ইতিহাস

আইনি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতার পাশাপাশি এই ঘটনার পেছনে জড়িয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ আবেগ ও ইতিহাস। নথিপত্র অনুযায়ী, কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্থাপিত হয়েছিল ১৯২৪ সালে। অথচ, এই বাঁকড়া মসজিদটি নির্মিত হয়েছে তারও ৩৪ বছর আগে, ১৮৯০ সালে। অর্থাৎ, বিমানবন্দর তৈরির বহু আগেই স্থানীয় গ্রামের মানুষের নিজস্ব অর্থায়নে এই ঐতিহাসিক মসজিদটি গড়ে উঠেছিল।

সে সময় এই অঞ্চলটি ছিল অবিভক্ত বাংলার অংশ। আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে রচিত বিভিন্ন প্রবন্ধ ও দলিল থেকে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে এই মসজিদের নাম ছিল ‘গৌরীপুর জামে মসজিদ’। কালের বিবর্তনে এবং বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের ফলে পরবর্তীতে এর নাম হয় ‘বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদ’। অবিভক্ত বাংলার সময় থেকেই আজ যেখানে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা, সেই অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও মানুষ এসে এই ঐতিহাসিক মসজিদে নামাজ আদায় করতেন।

বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এর আগে এত বড় এবং ঐতিহাসিক কোনো মসজিদে নামাজ বন্ধ বা স্থানান্তরের ঘটনা সচরাচর ঘটেনি। ফলে এই ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রশাসন ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে আন্তর্জাতিক নিয়ম মানা ছাড়া তাদের কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। তবে স্থানীয় ভাবাবেগকে মর্যাদা দিয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে মসজিদ কমিটির পুনর্বাসন ও নতুন স্থানে মসজিদ নির্মাণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। আপাতত যেকোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলার অবনতি রুখতে ৭ নম্বর গেট সংলগ্ন এলাকাকে কড়া পুলিশি পাহারায় রাখা হয়েছে।