প্রতীকি ছবি
Abandoned child finds a new mother.
বিশেষ প্রতিবেদন
তিন বছর আগের কথা। রাজস্থানের দৌসা জেলার মেহেন্দিপুর বালাজি মন্দির প্রাঙ্গণের এক কোণে কান্নাভেজা গলায় পড়ে ছিল এক শিশু। বিশ্ব সংসার যখন নিজের নিয়মে ব্যস্ত, তখন কেবল তিন বছরের সেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (Special Needs) শিশুকন্যাটি বুঝেছিল পরিত্যক্ত হওয়ার যন্ত্রণা। যে আপন মানুষেরা তাকে আগলে রাখার কথা ছিল, তারাই তাকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল নিয়তির হাতে।
কিন্তু মানুষের তৈরি সীমানা আর নিষ্ঠুরতার চেয়েও ভালোবাসার টান যে কত গভীর হতে পারে, সেই সত্যিটাই আবার প্রমাণ হলো।
‘দ্য হিন্দু’ (The Hindu)-র একটি বিশেষ রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তিন বছর আগে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে উদ্ধার হওয়া সেই শিশুকন্যাটি এতদিন ঠাঁই পেয়েছিল স্পেশালাইজড অ্যাডপশন এজেন্সির (Specialised Adoption Agency) হোমে। সেখানকার কর্মীরাই স্নেহে-যত্নে বড় করে তুলছিলেন তাকে। তবে তার স্থায়ী একটি পরিবার ও মায়ের ভালোবাসার প্রয়োজন ছিল। অবশেষে, দূর ফ্রান্স (France) থেকে এক একক নারী (Single Mother) এগিয়ে এলেন তাকে নিজের সন্তান হিসেবে আপন করে নিতে।
‘দ্য হিন্দু’-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেন্ট্রাল অ্যাডপশন রিসোর্স অথরিটি (CARA)-র মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক দত্তক (Inter-country Adoption) প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট, ২০১৫ (২০২২ সালে সংশোধিত) এবং কারার (CARA) সমস্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলী মেনে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপটি নেওয়া হয়। দৌসা জেলায় এটিই ছিল এ ধরনের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক দত্তক প্রক্রিয়া।
দৌসার জেলা কালেক্টরেট অফিসে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলা কালেক্টর সৌমিয়া ঝা, প্রিন্সিপাল ম্যাজিস্ট্রেট ঐশ্বর্য জাগরওয়াল এবং অ্যাডপশন এজেন্সির আধিকারিকেরা। তিন বছর ধরে যে ছোট্ট মেয়েটিকে তারা চোখের সামনে বড় হতে দেখেছেন, তাকে হাজার হাজার মাইল দূরের দেশে এক নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে বিদায় জানানোর সময় সবার চোখেই ছিল জল। কিন্তু সেই জলের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অসীম আনন্দ—শিশুটির একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ পাওয়ার আনন্দ।
বিদায়বেলায় নতুন ফরাসি মায়ের হাতে উপহার ও ভালোবাসার স্মারক তুলে দেওয়া হয়। জেলা কালেক্টর সৌমিয়া ঝা নতুন মায়ের সাথে শিশুটির ভবিষ্যৎ শিক্ষা, সঠিক প্রতিপালন এবং নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত ফলো-আপ রিপোর্ট পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।
CARA-র সুপারিনটেনডেন্ট নরেন্দ্র সিং দ্য হিন্দু-কে জানান, “বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পরিবার খুঁজে পাওয়া সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বেশিরভাগ দম্পতিই সাধারণ বা সুস্থ শিশু দত্তক নিতে চান।” কিন্তু সব বাধা, ভৌগোলিক দূরত্ব আর সমাজিক সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে এই ফরাসি মা প্রমাণ করলেন— মাতৃত্বের কোনো ভৌগোলিক সীমানা হয় না, আর ভালোবাসার জন্য কোনো শর্ত লাগে না।
রাজস্থানের এক ধূলিমলিন মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুটি আজ পাড়ি দিচ্ছে ফ্রান্সে। হাজার হাজার মাইল দূরে এক নতুন দেশ, নতুন ভাষা আর নতুন সংস্কৃতি তাকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে একটি মায়ের উষ্ণ কোল, একটি পরিবারের ভালোবাসা আর এক নিরাপদ ভবিষ্যৎ। মানুষের নির্মমতা দিয়ে যে গল্পের শুরু হয়েছিল, এক মায়ের নিঃশ্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে আজ তা পরিণতি পেল এক সুন্দর আশার গল্পে।
