‘ভাগ্যে যা-ই থাক,দেশে ফিরবই’— মৃত্যুদন্ডের রায় মাথায় নিয়ে দিল্লি থেকে হুঙ্কার হাসিনার

Sheikh Hasina faces the international media for the first time since leaving the country

বিশেষ প্রতিবেদন

দিনটা ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দ্রোহের দাবানলে জ্বলছিল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, খুলনা থেকে রাজশাহী। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী আন্দোলন, অগণিত ছাত্র-জনতার মৃত্যু আর গণভবন ঘেরাওয়ের মুখে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন ভারতে। তার পর দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে দুটো বছর। ঢাকার ট্রাইব্যুনাল থেকে জারি হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া বা গ্রেফতারি পরোয়ানা, অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণে বদলে গিয়েছে ওপার বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ। কিন্তু সেই ভারত ছাড়েননি, আর নিজের অবস্থান থেকেও সরেননি আওয়ামী লীগ নেত্রী। বুধবার, সেই ঐতিহাসিক পতন-দিবসের বর্ষপূর্তিতেই দিল্লির মঞ্চ থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে হুঙ্কার ছাড়লেন তিনি— “আমার ভাগ্যে যা-ই ঘটুক না কেন, আমি আমার দেশের মানুষের কাছেই ফিরে যাব।”

নয়াদিল্লির ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’ (এফসিসি)-র আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে গত দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন শেখ হাসিনা। তবে তাঁকে শুধু চোখ দিয়ে দেখা বা কথা শোনাই নয়, ওপার বাংলার রাজনীতির জল মাপতে মুখিয়ে ছিল পুরো রাজনৈতিক মহল।

২০২৪-এর সেই অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ: প্রতিবেদন বুঝতে ফিরে তাকাতে হবে দুই বছর আগের সেই অভিশপ্ত জুলাই-আগস্টে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এক লহমায় পরিণত হয়েছিল অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। রাজপথে ঝরেছিল শতাধিক তাজা প্রাণ, কারফিউ আর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের থমথমে আবহে পুরো বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল এক যুদ্ধক্ষেত্র। অবশেষে ৫ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির মুখে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করলে অবসান ঘটে তাঁর টানা ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনের। গঠিত হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার, আর রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে আওয়ামী লীগের তৎকালীন কার্যকলাপের ওপর নেমে আসে আইনি ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা।

দিল্লির মঞ্চ থেকে হাসিনার পাল্টা চাল: বুধবারের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ওপার বাংলায় ফেরার ও দল গোছানোর মরিয়া চেষ্টা তিনি ছাড়েননি। নিজের সরকার পতনের পেছনের প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি বলেন, “২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের ঘটনাটা একেবারেই কোনো শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। ওটা ছিল ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে তৈরি করা এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।” তিনি দাবি করেন, কোটা সমস্যার সমাধানের জন্য তিনি নিজে আন্দোলনকারীদের গণভবনে ডেকেছিলেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছাত্রদের দাবি মানার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একদল রাজনৈতিক গোষ্ঠী সেই আন্দোলনকে ‘হাইজ্যাক’ করে সরকার ফেলার চক্রান্তে মেতে ওঠে।একই সাথে নিজের দল আওয়ামী লীগের ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বিশ্বমঞ্চের সহায়তা প্রয়োজন।

আইনি পরোয়ানা বনাম রক্তে লেখা ক্ষোভ: বর্তমানে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ঝুলছে। ইতিমধ্যেই জারি রয়েছে পরোয়ানা। তবে নিজের এই ভবিষ্যৎ পরিণতি জেনেও শেখ হাসিনা বলেন, “যে পরিণতিই আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকুক, রক্ত দিয়ে তৈরি করা বাংলাদেশে আমি আবার পা রাখব।”তবে হাসিনাকে কি আদৌ বাংলাদেশে ফেরানো সম্ভব? ঢাকার বর্তমান প্রশাসন বারবার তাঁকে হস্তান্তরের জোর দাবি তুললেও দিল্লি এখনো কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতেই ব্যস্ত। বুধবারের এই অনুষ্ঠান থেকেও দূরত্ব বজায় রেখেছে মোদী সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্ষপূর্তির দিনটিতে দিল্লিতে বসে দেওয়া হাসিনার এই ভাষণ কেবলই একটি বক্তব্য নয়, বরং ওপার বাংলায় ঝিমিয়ে পড়া আওয়ামী লীগ কর্মীদের চাঙ্গা করা এবং ঢাকার ট্রাইব্যুনালের চাপ কাটাতে একটি বড় কৌশলগত চাল। ঢাকা কি আবার অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠবে, নাকি এই হুঙ্কার স্রেফ ওপার বাংলায় রাজনৈতিক ধোঁয়াশা তৈরি করবে— সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ভবিষ্যতেই মিলবে।

তথ্যসূত্র: দ্য হিন্দু, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস নাও, এনডিটিভি