প্রতীকি ছবি
Maldah’s Taltala village stranded across the Bangladesh border.
বিশেষ প্রতিবেদন
“আকাশ আমার, বাতাস আমার, মাটির বুকে টান, তবু কেন ওরে কাঁটাতারে আটকে আমার প্রাণ?”
চারিদিকে উৎসবের আলো, স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তিতে লালকেল্লা থেকে গলির মোড়—সর্বত্র উড়ছে তেরঙ্গা। অথচ দেশের সেই একই মানচিত্রের এক প্রান্তে, মালদার বাবুনগোলা ব্লকের চাঁদপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের তালতলা গ্রামে বাজছে এক বিষাদময় সুর। ভারতের নাগরিকত্বের সচিত্র পরিচয়পত্র পকেটে নিয়ে, প্রতি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেও এই গ্রামের ২৪টি পরিবার আজ ২১ বছর ধরে এক অদ্ভুত ‘পরাধীনতা’র শিকল পরেনি, কিন্তু আটকে রয়েছে এক অদৃশ্য খাঁচায়।
২০০৫ সালের সেই অভিশপ্ত দাগ
২০০৫ সালে যখন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হয়, তখন ভৌগোলিক মারপ্যাঁচে তালতলা গ্রামের এই ২৪টি পরিবার আচমকাই মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেড়ার ওপারে পড়ে যায়। একদিকে কাঁটাতার, অন্যদিকে সীমান্ত চিহ্নিতকারী পুনর্ভবা নদী, যার ঠিক ওপারেই বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার সাপাহার থানার আদাতলা গ্রাম। মাঝখানে এক চিলতে ভারতীয় ভূখণ্ডে বিএসএফ-এর ৮৮ নম্বর তালতলা বিওপির নজরদারিতে দিন কাটে তাঁদের।
পকেটে ভারতের পরিচয়পত্র, জীবনে গেটের ঘড়ি
নিজের দেশের মাটিতে পা রাখতে গেলেও এই বাসিন্দাদের পার হতে হয় কাঁটাতারের গেট। মানতে হয় ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্দিষ্ট সময়, আর বিএসএফের কাছে প্রমাণ করতে হয় নিজের পরিচয়। দিনের বেলা যেমন-তেমন, কিন্তু রাত নামলেই বাড়ে বুকচাপা আতঙ্ক।
- “হঠাৎ মাঝরাতে কোনো শিশু বা অন্তঃসত্ত্বা অসুস্থ হয়ে পড়লে কী হবে?”
- “জরুরি চিকিৎসায় কয়েক মিনিটের পথ যখন বন্ধ গেটের সামনে আটকে যায়, তখন নিয়তি ছাড়া আর কার কাছে হাত পাতা যায়?”
শুধু কি চিকিৎসার চিন্তা? নদী পেরিয়ে ওপার থেকে দুষ্কৃতীদের ঢুকে গবাদি পশু চুরি, সন্তানদের পড়াশোনা আর দৈনন্দিন জীবনের প্রতি পদক্ষেপে বাধা—সব মিলিয়ে তাঁদের অস্তিত্ব আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
“আমাদের আর কিছু চাই না, শুধু কাঁটাতারের এপারে নিয়ে আসুন। আমরা নিজের দেশের মাটিতে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে চাই।” — কান্নাভেজা কণ্ঠে আকুতি এক গ্রামবাসীর।
আশ্বাসের আলো নাকি শুধুই সময়ক্ষেপণ?
সম্প্রতি এই মানবিক বিপর্যয়ের কথা জানতে তালতলা গ্রামে পৌঁছেছিলেন রাজ্যের সেচ ও আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী তথা এলাকার বিধায়ক জুয়েল মুর্মু। সঙ্গে ছিলেন বিএসএফ আধিকারিক ও পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরা। গ্রামবাসীদের সেই আবেগপ্রবণ আকুতি শুনে মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, জেলা প্রশাসন ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলে এই ২৪টি পরিবারকে কাঁটাতারের এপারে এনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—স্বাধীনতার এতগুলো দশক পার করে এসেও কেন নিজের দেশের নাগরিকদের জীবনের বিনিময়ে এই সীমান্ত-যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে? তালতলার এই ২৪টি পরিবারের চোখ এখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে। কাঁটাতারের ওপারে আটকে থাকা এই মানুষগুলো কি অবশেষে ভারতের মূল ভূখণ্ডে নিজেদের ঘর খুঁজে পাবেন, নাকি সীমান্তের এপার-ওপারের টানাপোড়েনেই হারিয়ে যাবে তাঁদের আরও একটি প্রজন্ম?
