পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর ও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ: নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করল সুপ্রিম কোর্ট

Removal of names from SIR and voter lists: Supreme Court seeks report from Election Commission.

বিশেষ প্রতিবেদন

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR)-কে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একাধিক আবেদনের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) কাছে এসআইআর আপিল ট্রাইব্যুনালে ঝুলে থাকা আপিলগুলোর বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ও পর্যবেক্ষণ

শুনানি চলাকালীন শীর্ষ আদালত নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট নোটিশ জারি করে জানায়, বকেয়া আপিলগুলোর মধ্যে ঠিক কতগুলি আপিল তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ভোটারদের (পেন্ডিং অ্যাপিলেশনের ধরন অনুযায়ী) এবং কতগুলি নতুন অন্তর্ভুক্তির জন্য, তা পৃথকভাবে উল্লেখ করতে হবে। কতগুলি ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে ঝুলে রয়েছে এবং এই বিশালাকার বকেয়া মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আরও অতিরিক্ত কতগুলি আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজন, সে সম্পর্কেও কমিশনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে।

আদালত উল্লেখ করে যে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাগরিকদের একটি যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে বিচার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তাই এই ট্রাইব্যুনালগুলোর কাজকে আরও সুসংগঠিত করা এবং পরিকাঠামোগত সমস্যা মেটানোর ওপর জোর দিচ্ছে বেঞ্চ।

আদালতে আবেদনকারীদের চাঞ্চল্যকর যুক্তি

শুনানিতে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়াল করে অভিযোগ করেন, “লাখ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।” তিনি একটি নির্বাচনের ফলাফলের পরিসংখ্যান টেনে বলেন, “এমন একটি কেন্দ্র রয়েছে যেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল ১৫,০০০ ভোট, অথচ সেখানে ২৭,০০০ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে”।

অন্যদিকে, প্রসেনজিৎ বসু ও লোকসভার প্রাক্তন সাংসদ তথা কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর দায়ের করা আবেদনের পক্ষে আইনজীবী গোপাল সংকরনারায়ণন ও নেহা রাঠি সওয়াল করেন। আদালতকে জানানো হয়, রাজ্য জুড়ে প্রায় ৩৪ লাখ বকেয়া আপিলের মধ্যে ট্রাইব্যুনালগুলি এখনো পর্যন্ত খুবই অংশের শুনানি সম্পন্ন করতে পেরেছে। কলকাতা হাইকোর্টের এক পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, বর্তমান গতিতে কাজ চললে এই বিপুল সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি হতে প্রায় ২১ বছর লেগে যেতে পারে।

মামলাকারীদের দেওয়া পরিসংখ্যানে আরও দাবি করা হয়, এখন পর্যন্ত যে আবেদনগুলোর শুনানি হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই ভোটারের নাম পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এই পরিস্থিতিতে আপিল প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) প্রকাশ করার দাবি জানানো হয়েছে।

এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া এবং আদালতের পূর্ববর্তী রায়

এর আগে চলতি বছরের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় এসআইআর প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা বজায় রেখেছিল। আদালত জানিয়েছিল, এই নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াটি ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act) বা নিয়মের পরিপন্থী নয়।

নির্বাচন কমিশনের যুক্তি ছিল— বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনও নিবিড় সংশোধন না হওয়া, রাজ্য জুড়ে ব্যাপক হারে নগরায়ণ, পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভোটারের নাম পুনরাবৃত্তি বা ভুল সংশোধনের জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল। সে সময় সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভিত্তি হলো নির্ভুল ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি রক্ষা করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে মূল সংশোধন প্রক্রিয়ার বৈধতা মিললেও, এর ফলে বাদ পড়া লাখ লাখ সাধারণ মানুষের ভোটার অধিকার পুনর্বহালের আপিল যেভাবে ধীরগতিতে এগোচ্ছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত। পুরো আপিল ব্যবস্থার পরিকাঠামো খতিয়ে দেখে কমিশনকে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে সর্বোচ্চ আদালত।

তথ্যসূত্র: সুপ্রিম কোর্টের শুনানি সংক্রান্ত তথ্য, আইনি পোর্টাল LawBeat, দ্য হিন্দু ও অন্যান্য জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে লেখা।