Fear of a new danger in Nepal
বিশেষ প্রতিবেদন
হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস, ২৪ লক্ষ টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপে চাপা জনপদ; নতুন হিমবাহ ধসের আশঙ্কায় আতঙ্ক
এক মুহূর্তে বদলে গেল পাহাড়ি জনপদের ছবি। শান্ত পাহাড়ি নদী পরিণত হল ধ্বংসের স্রোতে। হিমবাহ ধসের পর প্রবল জলস্রোত, কাদা, পাথর আর ধ্বংসস্তূপ নেমে এসে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিল নেপাল-চীন সীমান্ত সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা। ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১,০৫০ ছাড়িয়েছে। এখনও প্রায় ৪,০০০ মানুষ নিখোঁজ। নেপাল ও চিন মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা ৪,৪০০-র বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বহু জায়গায় এখনও পৌঁছতে পারেনি উদ্ধারকারী দল। জাতিসংঘ জানিয়েছে, বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকার সঙ্গে এখনও সম্পূর্ণ যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে মৃত ও নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা জনপদ
বিপর্যয়ের ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট ত্রিশূলী করিডোরের পরিস্থিতিতে। হিমবাহ ধসের পর প্রবল জলস্রোতের সঙ্গে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর, গাছপালা ও পলিমাটি। নদীর গতিপথের আশপাশের বহু বাড়িঘর, রাস্তা ও সেতু ভেসে যায় অথবা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-র প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের ফলে ২৪ লক্ষ টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে। বাড়িঘরের ভাঙা অংশ থেকে শুরু করে গৃহস্থালির সামগ্রী, গাছপালা, পাথর ও পলিমাটি—সবকিছু মিশে তৈরি হয়েছে বিশাল বর্জ্যের স্তূপ।
UNDP-র আবাসিক প্রতিনিধি কিয়োকো ইয়োকোসুকা এই পরিস্থিতিকে ত্রিশূলী করিডোরের জনবসতিগুলির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিষ্কার করাই এখন প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিপর্যয়ের আগেই কি মিলেছিল সতর্কবার্তা?
এই ভয়াবহতার মধ্যেই সামনে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিজ্ঞানীদের একটি কনসোর্টিয়ামের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যে হিমবাহ ধসের পর এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল, সেখানে কয়েক দিন আগেই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল।
বরফগলা জলের রং বাদামি হয়ে যাওয়া এবং আশপাশের পাহাড়ি শিলায় ফাটল দেখা দেওয়ার মতো পরিবর্তন নজরে এসেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সেই লক্ষণগুলি আরও আগে চিহ্নিত করা গেলে কি বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হত?
এর মধ্যেই নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে চিনের সতর্কবার্তা। চিনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি এবং দেশটির জলসম্পদ মন্ত্রকের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, নেপালের ওই বিপর্যস্ত এলাকার আশপাশের আরও কয়েকটি হিমবাহ এখনও ধসে পড়তে পারে। ফলে নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গণকবর, নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা
উদ্ধারকাজের পাশাপাশি চলছে মৃতদেহ শনাক্তকরণের কঠিন প্রক্রিয়া। CNN-এর নেপাল টিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বহু অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে প্রশাসনকে গণকবরের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। অন্যদিকে, নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে এখনও অপেক্ষা করছেন হাজার হাজার পরিবার।
NDRRMA জানিয়েছে, রাসুভা এবং নুওয়াকোট জেলার কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ এখনও ত্রাণসামগ্রীর ঘাটতির মুখে রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে খাবার, পানীয় জল ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া
এই বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, এই ধরনের বিপর্যয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নিয়ে ‘কোনও সন্দেহ নেই’।
বিজ্ঞানীদের একাংশও হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, বরফ গলার প্রবণতা এবং চরম আবহাওয়ার সঙ্গে এ ধরনের আকস্মিক বিপর্যয়ের সম্ভাব্য সম্পর্ক খতিয়ে দেখছেন।
এই মুহূর্তে নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—নিখোঁজদের সন্ধান, দুর্গতদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং নতুন করে হিমবাহ ধসের ঝুঁকি মোকাবিলা করা। পাহাড়ি নদীর জল কিছুটা শান্ত হলেও বিপদের ছায়া এখনও কাটেনি। বরং নতুন হিমবাহ ধসের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
