ঝাড়খণ্ডে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ বিতর্ক: ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর বিস্ফোরক অন্তর্তদন্ত

Controversy over removal of names from the voters’ list in Jharkhand

বিশেষ প্রতিবেদন

ঝাড়খণ্ডে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল সামারি রিভিশন’ (SIR) চলাকালীন বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদনকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গোড্ডা জেলায় বিজেপি বুথ এজেন্টদের জমা দেওয়া ‘ফর্ম ৭’ এবং তার উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে মারাত্মক সংশয়। পুরো বিষয়টি বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে সামনে এনেছে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি বিশেষ অন্তর্তদন্ত।

গণহারে ‘ফর্ম ৭’ জমা এবং বিতর্কিত ভূমিকা

ভোটার তালিকা থেকে কারো নাম বাদ দেওয়ার আইনি মাধ্যম হলো ‘ফর্ম ৭’। কোনো ভোটার মারা গেলে, স্থানান্তরিত হলে, দ্বৈত নাম থাকলে বা নাগরিকত্ব না থাকলে এই ফর্মের মাধ্যমে আপত্তি তোলা যায়। তবে গোড্ডায় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ এমন ফর্ম জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তে উঠে এসেছে যে, বিজেপির বুথ স্তরের এজেন্টরা (BLA) একসাথে বহু ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন নিয়ে বুথ স্তরের আধিকারিকদের (BLO) কাছে পৌঁছাচ্ছেন। সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যাঁদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে, তাঁদের একটি বড় অংশই সংখ্যালঘু বা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।

এক বুথে ২৫, অন্য বুথে ফর্ম পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তে গোড্ডার একাধিক বুথ ঘুরে অত্যন্ত নাটকীয় কিছু ছবি ধরা পড়েছে:

  • মহেশতিকরি ৯ নম্বর বুথ: বিজেপি বুথ এজেন্ট সঞ্জীব কুমার রোশন প্রায় ২৫টি ‘ফর্ম ৭’ নিয়ে বুথ আধিকারিক অনিশা বানোর কাছে যান। সংশ্লিষ্ট আধিকারিক জানান, ওই তালিকায় থাকা প্রত্যেকটি নামই মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটারের।
  • ফর্ম পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা: পাশের একটি বুথে আর এক বিজেপি এজেন্ট গণোরি মণ্ডল প্রায় ৭৫টি ‘ফর্ম ৭’ নিয়ে হাজির হন। কিন্তু আধিকারিকরা যখন সেই ফর্মগুলির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এরপর ওই এজেন্ট সমস্ত ফর্ম সেখানেই পুড়িয়ে ফেলেন। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তে ওই বিজেপি এজেন্ট নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি ফর্মগুলির প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতেন না এবং স্থানীয় দলীয় কার্যালয় থেকে নির্দেশ পেয়েই সেগুলি জমা দিতে গিয়েছিলেন।

যাঁদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন, তাঁরা কি সত্যিই বহিরাগত?

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তে সবথেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ভুক্তভোগীদের পরিচয় ঘিরে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিনিধিরা মহেশতিকরি গ্রামের যাঁদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে, তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তাঁদের বক্তব্য ও নথিপত্র প্রমাণ করে যে তাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে ওই গ্রামেরই বাসিন্দা:

  • আবদুল মান্নান খান (৭০): তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে এখানে বাস করছে। “এটাই আমাদের বাড়ি, আমরা ঝাড়খণ্ডের মানুষ, তাহলে আমাদের নাম বাদ যাবে কেন?”
  • মহম্মদ নওশাদ: জানান যে, তাঁদের পরিবারের নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকাতেও ছিল। কাজের সূত্রে বাইরে যেতে হলেও তিনি ঝাড়খণ্ডেই ভোট দেন। নাম বাদ গেলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন তিনি।
  • মহম্মদ শফিক (৮০) ও বিবি বাসিলান: ১৮ বছর বয়স থেকে ভোট দিয়ে আসছেন শফিকবাবু। তাঁদের কাছে জমি-জমার পুরনো খতিয়ান সহ যাবতীয় সরকারি নথি রয়েছে।

ফলে বিজেপির আনা ‘বহিরাগত’ বা ‘ভুয়ো ভোটার’-এর অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব ছবির বড়সড় অমিল প্রকাশ পেয়েছে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এই অন্তর্তদন্তে।

বিজেপির বক্তব্য ও প্রশাসনিক অবস্থান

অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজেপি নেতৃত্ব। প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক অমিত কুমার মণ্ডলের দাবি, ভোটার তালিকার ভুল বা দ্বৈত নাম থাকলে আপত্তি জানানো বুথ এজেন্টদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কতগুলি ফর্ম জমা দেওয়া যাবে, তার কোনো নির্দিষ্ট আইনি সীমা নেই। বুথ এজেন্ট সঞ্জীব কুমারও জানান যে, তিনি স্থানীয় প্রাক্তন বিধায়কের কাছ থেকেই এই ফর্মগুলি পেয়েছিলেন।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক দিক থেকেও বিষয়টি স্পর্শকাতর। ঝাড়খণ্ডের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক কে রবি কুমার জানান, নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো এজেন্ট একাধিক স্থানে নাম থাকা ভোটারের বিরুদ্ধে ‘ফর্ম ৭’ জমা দিতে পারেন এবং এতে বেআইনি কিছু নেই। তবে গোড্ডার ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক (BDO) শ্রীমান মারান্ডি স্পষ্ট করেছেন যে, উপযুক্ত তদন্ত ও শক্ত প্রমাণ ছাড়া এভাবে গণহারে আপত্তি তোলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কোনো ভোটারের নাম হুট করে বাদ দেওয়া যায় না, তার জন্য সঠিক প্রশাসনিক যাচাইকরণ বাধ্যতামূলক।

ভোটাধিকার রক্ষার আসল প্রশ্ন

ঝাড়খণ্ডে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর ইতিমধ্যেই প্রায় ৪৩ লক্ষ ভোটারের (মোট ভোটারের প্রায় ১৬.৪৮%) নাম বাদ পড়েছে। ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি জানানোর প্রক্রিয়া খোলা ছিল।

এই আবহে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তের মাধ্যমে উঠে আসা এই ঘটনাটি কেবল একটি জেলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বা বৈধ নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, সেই বড় প্রশ্নটিই তুলে ধরেছে এই তদন্ত। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় দ্বৈত ভোটার সংশোধন করা যেমন জরুরি, তেমনই কোনো যোগ্য ভারতীয় নাগরিক যেন প্রশাসনিক গাফিলতি বা রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার না হন, তা সুনিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।