রূপালী পর্দার খলনায়ক, বাস্তব জীবনের মসিহা: নানা পাটেকর ও ‘নাম ফাউন্ডেশন’

Nana Patekar is a true friend of the poor.

চলচ্চিত্রের পর্দায় তাঁর এক একটি সংলাপ দর্শকের মনে শিহরণ জাগায়— “এক মচ্ছর আদমি কো হিজড়া বানা দেতা ..” কিংবা গম্ভীর গলায় সমাজ বাস্তবতার কাটাছেঁড়া। পর্দায় তাঁর ক্ষিপ্ত মেজাজ, অতুলনীয় অভিনয় দক্ষতা এবং অদম্য ব্যক্তিত্ব আমাদের মুগ্ধ করে। কিন্তু রিল লাইফের এই ‘হিরো’-কে যদি শুধু পর্দার চরিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়, তবে তাঁর আসল সত্তার প্রতি বড় অন্যায় করা হবে। কারণ, বলিউডের ঝলমলে এবং কৃত্রিম দুনিয়ায় যখন অধিকাংশ তারকাই নিজেদের প্রচারের আলোয় ব্যস্ত, তখন নানা পাটেকর নীরবে হেঁটে চলেছেন এক অন্য পথে—যে পথ মানবতা, আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের মুক্তির। পর্দায় তিনি হয়তো রক্তচক্ষু খলনায়ক বা পুলিশ অফিসার, কিন্তু বাস্তবে তিনি খরা-পীড়িত বাংলার (মারাঠা ভূমির) লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে এক সাক্ষাৎ দেবতা, এক পরম আশ্রয়।

শূন্য থেকে শুরু এবং শেকড়ের টান

খুব সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা নানা পাটেকর কখনো নিজের শেকড় ভোলেননি। সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও তিনি গ্ল্যামার বা প্রচারের আলো বা কোনো জমকালো পিআর মেশিনারি (PR machinery)-র তোয়াক্কা করেননি। বরং নিজের উপার্জিত অর্থ, ব্যক্তিগত সময় এবং সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্য—যাঁরা আমাদের অন্ন জোগান, অথচ যাঁদের মুখে দু’বেলা অন্ন জোটে না, সেই দেশের অন্নদাতা কৃষকদের জন্য।

মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া ও বিদর্ভ অঞ্চলের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে খাঁ খাঁ করা বন্ধ্য জমি, ফেটে চৌচির হওয়া মাটি আর চরম জলের হাহাকার। প্রকৃতির নিষ্ঠুর মার এবং ঋণগ্রস্ততার জ্বালায় যখন বছরের পর বছর ধরে শত শত কৃষক চরম হতাশা থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছিলেন, তখন নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারেননি নানা।

‘নাম ফাউন্ডেশন’: খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা জীবনের আশার আলো

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অভিনেতা মকরন্দ অনাপুরে-কে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (NAAM Foundation)। যদিও সূত্রপাত আরও আগে, তবে এই উদ্যোগ পরবর্তীতে একটি পূর্ণাঙ্গ গণআন্দোলনে রূপ নেয়।এই ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য কেবল কিছু অনুদান দেওয়া নয়, বরং কৃষকদের স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা। ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর কাজের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক:

  • জল সংরক্ষণ ও সেচ ব্যবস্থা: খরা কবলিত গ্রামগুলোতে জলের অভাব মেটাতে চেক ড্যাম নির্মাণ, গভীর ভূগর্ভস্থ জলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, এবং অবহেলিত ও পরিত্যক্ত খাল ও জলাশয়গুলোর পুনরুজ্জীবন করা হয়েছে। জল এসেছে তো মাটি উর্বর হয়েছে, আর উর্বর মাটিতে সোনালী ফসল ফলেছে।
  • সরাসরি আর্থিক সহায়তা ও ঋণ মুক্তি: খরা, ফসলহানি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত কৃষক পরিবারগুলোর হাতে সরাসরি আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া। আত্মহত্যা করা কৃষক পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের আইনি ও আর্থিক কাউন্সেলিং দেওয়া।
  • মহিলাদের স্বনির্ভরতা: শুধু কৃষকরাই নন, গ্রামের নারীদের জন্যও নানা পাটেকর ও তাঁর দল এনেছেন নানা কর্মসংস্থানের সুযোগ। ঘরে ঘরে নারীদের স্বনির্ভর করে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবাদের ভাষা ও রাজপথের লড়াকু সৈনিক

নানা পাটেকর কেবল দাতা নন, তিনি এক লড়াকু প্রতিবাদী। সরকারি উদাসীনতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিরুদ্ধে তিনি বারবার রাস্তায় নেমেছেন। কৃষকদের দুর্দশা জাতীয় স্তরে তুলে ধরতে তিনি মিছিল, ধর্না এবং অনশনের মতো পদক্ষেপ নিতে পিছপা হননি। সংবাদমাধ্যমের কভারেজের তোয়াক্কা না করে তিনি ছুটে গেছেন মহারাষ্ট্রের প্রতিটি কোণায়, যেখানে মানুষ একটু জলের জন্য হাহাকার করেছে।

বলিউডে বহু মেগাস্টার এসেছেন এবং গেছেন, যাঁদের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। কিন্তু নিজের সর্বস্ব দিয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিঃশেষে সমর্পণ করার এমন নজির আধুনিক যুগে অত্যন্ত বিরল। নানা পাটেকর প্রমাণ করেছেন যে, সত্যিকারের নায়ক হতে গেলে মেকআপের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় বিশাল একটি হৃদয়ের।

এক বুক শ্রদ্ধা

আজ যখন আমরা সেলুলয়েডের নায়ককে নিয়ে মেতে থাকি, তখন আমাদের থাম একটু ভাবা উচিত—যাঁরা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, সেই কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবনের বড় একটা অংশ যিনি উৎসর্গ করে দিয়েছেন, সেই নানা পাটেকর আমাদের অসীম শ্রদ্ধার পাত্র।চলচ্চিত্রের ফ্রেম ছাপিয়ে তাঁর এই মানবিক মুখটিই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। নানা পাটেকর শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি আমাদের সমাজের এক জীবন্ত বিবেক—যিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের মতো বাঁচতে হয়।

আপনার কি মনে হয় বলিউডের অন্যান্য তারকাদেরও কি এমন সামাজিক ও মানবিক কাজে আরও বেশি করে এগিয়ে আসা উচিত?