স্ক্রিনের কোণ থেকে রাজপথ—দিল্লির ব্যারিকেড ভাঙল এক অন্য ভারতের জেদ

Crackdown in Delhi! Protesters hiding in toilets and gurdwaras.

বিশেষ প্রতিবেদন

যাঁরা এতদিন বলতেন আজকের প্রজন্ম কেবল মোবাইলের স্ক্রিনেই বন্দি, প্রতিবাদ করার ভাষা ভুলে গেছে, শনিবারের দিল্লি তাঁদের গালে সজোরে তিলক এঁকে দিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিতর্কিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া প্রত্যাহারের দাবিতে যন্তর মন্তরে আছড়ে পড়া যুবস্রোত প্রমাণ করে দিল—ভয় দেখিয়ে রক্তের আগুন ঠান্ডা করা যায় না। রাজধানী যখন ৩০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর বুটবট আর ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রেখে এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছিল, তখন সেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যূহকে ছাতু করে দিয়েছিল দেশের দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা তরুণ মনন।

ঘটনার কুশীলব আর দৃশ্যপটগুলো এক রাজনৈতিক থ্রিলারের চেয়ে কম নয়। শুক্রবার রাত থেকেই শুরু হয়েছিল ইঁদুর-বিড়াল খেলা। পুলিশের নজর এড়াতে কনট প্লেসের একটি মিউনিসিপ্যাল শৌচাগারে রাত কাটিয়েছেন কুড়ির বেশি তরুণ বিক্ষোভকারী। সকালে দরজা খোলার আগেই পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে রাজপথে নামার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। অন্যদিকে, বাংলাসাহিব গুরুদ্বারের চত্বর হয়ে উঠেছিল এক অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের অস্থায়ী মুক্তাঞ্চল। পুলিশ যখন গেটে কড়া পাহারা বসিয়েছে, তখন তরুণরা গুরুদ্বারের পবিত্র আশ্রয়ে গা ঢাকা দিয়ে সুযোগ বুঝে বাইরে বেরিয়ে স্লোগান তুলেছেন—‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘জয় ভীম’। ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতাকে সামনে রেখে একপাশে পুলিশের লাঠির ভয়, অন্যপাশে তরুণের চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ের জেদ—এই ছবি আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে জ্বলজ্বল করবে।

শুধু সাধারণ যুবসমাজই নয়; মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনারাই বিজয়ন, অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে শুরু করে কেরল হাউসের চারিত্রিক দৃঢ়তায় থাকা বাম নেতারা কিংবা মাঠে থাকা মানবাধিকার কর্মীরা—কাকেই বা আটক করেনি রাষ্ট্রযন্ত্র? সাংবাদিক, ইউটিউবার থেকে শুরু করে রাস্তা দিয়ে যাওয়া এক সাধারণ মানুষ, যিনি হয়তো রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন—কাউকে ছাড় দেয়নি পুলিশ। ছত্রশাল বা বাওয়ানার মতো দূরপাল্লার স্টেডিয়ামগুলোকে বানিয়ে তোলা হয়েছিল ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’। কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরে যখন বন্দিদের লাইন চলছে, ঠিক বাইরে অ্যাথলেটরা নিজেদের প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছিলেন—এ যেন আজকের ভারতের এক অদ্ভুত সমান্তরাল বিদ্রূপ।

সিজেপি-র এই আন্দোলন আজ আর কেবল কয়েকটি দলের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। মোদি-শাহ প্রশাসন যতবারই ব্যারিকেড উঁচু করেছে, যতবারই বন্দি করার চেষ্টা করেছে, ততবারই যুবসমাজের জেদ ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। অহিংসার এই লড়াই বুঝিয়ে দিয়েছে, গণতন্ত্র কেবল ভোটের বাক্সে নয়, রাজপথের শৌর্যেও বেঁচে থাকে।

আজ দিল্লির এই আন্দোলন আটকানো গেলেও এর তরঙ্গ শুধু রাজধানীতে আটকে থাকবে না। দেশের কোণায় কোণায় তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ একথারই জানান দিচ্ছে—আগামী দিনে কেন্দ্র সরকার এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে বড় কঠিন পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে আসছে। ভয় দেখিয়ে কণ্ঠরোধ করার এই নীতির বিপদ শাসককুলকে একদিন হাড়ে হাড়ে টের পেতে হবে।