Risk of disaster in Bhutan due to potential glacial lake outburst
নিজস্ব প্রতিবেদন –
হিমালয়ের কোলে ফের জলপ্রলয়ের ভ্রূকুটি! ভুটানে হিমবাহ গলে তৈরি একটি বিশালাকার হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসায় হড়পা বানের মারাত্মক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর জেরে ভারতের প্রতিবেশী এই দেশের জলপ্রবাহ সরাসরি এসে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের নদী অববাহিকায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই রাজ্যেই জরুরি সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলি থেকে বাসিন্দাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।

ভুটানের শিনতাফু হ্রদ থেকে ৭৪ লক্ষ ঘনমিটার জলের স্রোত প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ভুটানের ‘শিনতাফু’ (Shintafu) নামক হিমবাহ হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎই ভেঙে যায়। এর ফলে হ্রদ থেকে প্রায় ৭৪ লক্ষ ঘনমিটার জল হু হু করে নিচের দিকে নেমে আসে। এই বিপুল পরিমাণ জলধারা প্রথমে ‘মো ছু’ নদীর পথ ধরে পরবর্তীতে ভারত-ভুটান সীমান্তবর্তী ‘সঙ্কোশ’ (Sankosh) নদীর দিকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসছে।
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন’ বা কেন্দ্রীয় জল কমিশন সংশ্লিষ্ট জেলাগুলিকে অবিলম্বে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়। ইতিমধ্যেই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী গোটা পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।
আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারে জোরদার মাইকিং, প্রস্তুত ত্রাণশিবির হিমবাহ হ্রদের হড়পা বানের আশঙ্কায় পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার এবং অসমের ধুবড়ি জেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। সঙ্কোশ নদীর তীরবর্তী একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আলিপুরদুয়ার জেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাগাতার মাইকিং করে সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। ঘরবাড়ি ছাড়ার আতঙ্কে অনেক গ্রামবাসীকে গবাদি পশু ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে নিরাপদ উচ্চভূমির দিকে রওনা হতে দেখা গেছে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে স্থানীয় স্কুল ও কমিউনিটি হলগুলিকে অস্থায়ী ত্রাণশিবির হিসেবে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

রাজ্যের জলসম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সঙ্কোশ নদী ও তার শাখানদীগুলির অববাহিকায় বসবাসকারী প্রতিটি মানুষকে অবিলম্বে নদীর পার থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে আলিপুরদুয়ারের পাশাপাশি তুফানগঞ্জ ও কোচবিহারের নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদেরও বাড়তি সতর্কতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের সমস্ত স্তরের মানুষকে সাবধানে থাকার আবেদন জানিয়েছেন দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা।
অন্যদিকে, অসমের ধুবড়ি জেলা প্রশাসনও পরিস্থিতির ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। অসম রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (ASDMA) জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ সঙ্কোশ নদীর জলস্তর আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। তবে দুপুরের পর বা আগামী কয়েক ঘণ্টায় জলের মাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কী এই হিমবাহ হ্রদের হড়পা বান বা GLOF? জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে তৈরি হচ্ছে শত শত ছোট-বড় হ্রদ। বরফ, পাথর ও নুড়ির প্রাকৃতিকভাবে তৈরি দুর্বল বাঁধের ওপর এই বিশাল পরিমাণ জলের চাপ যখন আর সহ্য হয় না, তখন তা ভেঙে হঠাৎ নিচু উপত্যকায় নেমে আসে। একে পরিভাষায় ‘গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা GLOF বলা হয়।
সাধারণত ভূমিধস, তুষারধস, আকস্মিক অতিবৃষ্টি বা তীব্র ভূমিকম্পের জেরে এই ধরনের বিপর্যয় ঘটে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা এই প্রবল জলস্রোত সঙ্গে করে বিপুল পরিমাণ কাদা, বালি, পাথর ও গাছের গুঁড়ি বয়ে আনে। এর ফলে নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে রাস্তাঘাট, সেতু, জনবসতি ও কোটি কোটি টাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
স্মৃতিতে সিকিমের তিস্তা বিপর্যয় ভুটানের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই ২০২৩ সালের সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদ থেকে জল বেরিয়ে তিস্তা অববাহিকায় ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ট্র্যাজেডির স্মৃতি উসকে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্র আজ যে চরম সংকটের মুখে, তার প্রমাণ এই সীমান্ত পেরিয়ে আসা দুর্যোগগুলি। একটি দেশের প্রাকৃতিক পরিবর্তন যে মুহূর্তের মধ্যে প্রতিবেশী দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, ভুটানের এই ঘটনা তারই আরও এক সতর্কবার্তা।
