অভিষেকের বাড়ির সামনে ফের উত্তেজনা, পুলিশ কমিশনারের ইস্তফা দাবি মমতার

Mamata demands resignation of Police Commissioner

কালীঘাট থানার ওসি বলাই বাগকে কড়া বার্তা, প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারি তৃণমূল নেত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদন

কলকাতা: শুক্রবার রাতের সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই শনিবার দুপুরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল কালীঘাটে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনের এলাকা। পরিস্থিতি ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। এই আবহে বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব হলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দের ইস্তফা দাবি করার পাশাপাশি কালীঘাট থানার ওসি বলাই বাগকেও সরাসরি নিশানা করেন তিনি। তাঁদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হলে প্রয়োজনে মামলা করা এবং সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মমতা।

কালীঘাট থানার ওসিকে সরাসরি হুঁশিয়ারি

শনিবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে উত্তেজনার মধ্যেই কালীঘাট থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, কয়েকটি থানার পুলিশ নিজেদের সীমা অতিক্রম করে কাজ করছে। কালীঘাট থানায় নতুন ওসি হিসেবে বলাই বাগকে আনার প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে উদ্দেশ্য করে মমতা বলেন, “সব জানি বলাইবাবু! আপনার কী ক্ষমতা, কত প্রোমোশন পাবেন!” এর পরেই কড়া সুরে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “আপনার পরিবার ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক। আপনাকে শুভ দীপাবলি। মনে রাখবেন, জনরোষের যদি বিস্ফোরণ ঘটে!”পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে মমতা আরও বলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশের খারাপ ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। কোনও পরিস্থিতিতে পুলিশকে নিজের সীমার মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে, সেই বার্তাও দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, প্রয়োজন হলে এই বিষয়গুলি নিয়ে তিনি নিজেই আইনি পদক্ষেপ করবেন।

পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দের ইস্তফা দাবি

কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দকেও ছেড়ে কথা বলেননি মমতা। প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের পদত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “অজয় নন্দজি, বিনীতকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। কারণ তিনি মনে করেছিলেন, এটা তাঁর নৈতিক দায়িত্ব।” এর পরেই অজয় নন্দের ইস্তফা দাবি করেন তিনি। মমতার বক্তব্য, পুলিশ আধিকারিকদের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কোনও আধিকারিক যদি নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন বা সীমা অতিক্রম করেন, তা হলে তারও জবাব দিতে হবে।

পাড়ার কালীপুজো নিয়ে ক্ষোভ

অভিষেকের বাড়ির সামনের উত্তেজনার পাশাপাশি নিজের পাড়ার কালীপুজো ঘিরেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, পাড়ার একটি ক্লাবকে শুক্রবার রাতে পুজোর কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। আগে যে পুজো ভিতরের অংশে হত, এখন তা রাস্তার মোড়ে করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এর ফলে তাঁর বাড়ির সামনে যাতায়াত ও পুজোয় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ মমতার।

তিনি বলেন, “আমার ঘরে পুজো হয়। আমাদের পাড়ায় যে ক্লাব আছে, সেই ক্লাবকে কালকে রাতে কাজ করতে দেয়নি। এখন রোডের উপরে পুজো হচ্ছে। এটা বেআইনি। এখানে বেআইনিভাবে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” এর পরেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মমতা বলেন, “হামারা বুক ম্যায়, হামারা শরীর ম্যায় বুলডোজার চালাও। আমার বুকে বুলডোজার চালাও।” তাঁর অভিযোগ, পুজোর আয়োজনকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তাঁর পাড়ার মানুষ স্বাভাবিকভাবে ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে না পারেন। তবে পুজোর অনুমতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

রাত ৩টের হামলার অভিযোগ, বিজেপিকে নিশানা

শুক্রবার গভীর রাতে বিজেপির একদল কর্মী-সমর্থক এসে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন মমতা। তাঁর দাবি, গভীর রাতে যখন মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন, তখনই কালীপুজোর আয়োজনকে কেন্দ্র করে গোলমাল বাধানো হয়।

তিনি বলেন, “জনতাকে বলছি, রাত ৩টের সময় লুম্পেন নিয়ে এসে কেন কালীপুজোকে আক্রমণ করছ? আমাদের কাজকে কেন ডিস্টার্ব করছ? এটা পটুয়াপাড়া। দু’টোর সময় অনেক মা কালীর প্রতিমা এখান থেকে যায়। আপনারা কেন ঝামেলা করছেন?”নিজের পাড়ায় একাধিক কালীপুজোর আয়োজনের কথা উল্লেখ করে মমতার প্রশ্ন, পুজোর সময় এত পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজন কেন? তাঁর বক্তব্য, ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব প্রশাসনের।

অভিষেকের জন্মদিন ঘিরে সংঘর্ষ, জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষে শুক্রবার রাতে তাঁর বাড়ির সামনে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা জড়ো হয়েছিলেন। সেই সময় বিজেপির কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয় বলে জানা গিয়েছে। সংঘর্ষে দু’পক্ষের কয়েক জন আহত হন বলেও খবর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শনিবার সকালে অভিষেকের বাড়ির সামনের রাস্তায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করে জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ। এই নিষেধাজ্ঞা ঘিরেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, একদিকে বিজেপি গণতন্ত্র রক্ষার কথা বলছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় উৎসব পালন ও দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা তৈরি হচ্ছে। মমতা বলেন, “মাঝরাতে কারও বাড়িতে হামলা চালানোর অধিকার কাউকে কে দিয়েছে? বিজেপি নেতারা গণতন্ত্র বাঁচাও মিছিল করছেন। ওঁরা দাবি করছেন, গণতন্ত্র রক্ষা করতে চান। অথচ বাস্তবে ওঁরাই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছেন।” তাঁর বক্তব্য, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার কথা বলার পাশাপাশি মানুষের শান্তিতে উৎসব পালন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে যাবেন মমতা

পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার চেয়ে প্রয়োজনে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানিয়েছেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, কিছু পুলিশ আধিকারিক সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছেন এবং তাঁদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল। তিনি বলেন, “প্রয়োজন হলে আমি নিজে সুপ্রিম কোর্টে যাব এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এই বিষয়গুলি তুলে ধরব। কিছু থানা এবং পুলিশ আধিকারিক সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁরা কী করছেন, সে সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।”

মমতার দাবি, কোন আধিকারিককে কোথায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা কীভাবে কাজ করছেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁর কথায়, “কোনও জবাবদিহি ছাড়া এই ধরনের কাজ চলতে পারে না।”পাশাপাশি, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে মহিলাদের এগিয়ে আসার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

রাজনৈতিক সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে সংঘর্ষ, কালীপুজোর আয়োজন নিয়ে বিতর্ক এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মমতার সরাসরি আক্রমণ—সব মিলিয়ে কালীঘাটের ঘটনা নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। একদিকে বিজেপির বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল নেত্রী, অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ স্তর পর্যন্ত তাঁর আক্রমণের নিশানায় এসেছে।

কলকাতার পুলিশ কমিশনারের ইস্তফা দাবি থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারি—মমতার এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক চাপানউতোর কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর। একই সঙ্গে শুক্রবার রাতের সংঘর্ষের প্রকৃত ঘটনা, পুজোর অনুমতি নিয়ে ওঠা অভিযোগ এবং পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য সামনে আসাও গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *