আরজিকর মামলার রায়ের মাধ্যমে প্রশাসনকে কি বার্তা দিলেন বিচারক

লেখক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

প্রায় ছমাস পরে আর জি করের পড়ুয়া চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনের বিচার শেষ করে রায় দিলেন শিয়ালদা কোর্টের বিচারক। গত বছর অগাস্ট মাসের এক রাতে ৩১ বছরের ওই তরুণী কে ধর্ষণ ও খুনে দোষী সাব্যস্ত হয় সঞ্জয় রায়। বিচারক তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিয়েছেন। বিচার শেষে রায়ে এই নারকীয় অপরাধের ওপর যবনিকা পড়েও পড়লো না। যে তরুণ প্রান বড় অসময়ে চলে গেল সেই ক্ষতির পুরণ কি হল? বিশেষত এমন এক শহরে স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিযুক্ত নিজের কর্মস্থলে মেয়েটির যে ভাবে প্রাণ গেল তাতে চরম লজ্জিত শহরবাসী, প্রসাশনের মুখ কি ঢাকা পড়ল? এই প্রাণের শহর প্রগতিশীল ঐতিহ্যের ধারক, তিলোত্তমায় মেয়েরা নিরাপদ, বৈষম্যের শিকার নয় বলে আমাদের যে আস্ফালন তাতে কি সুচ বিঁধে রইলো না? আগামী দিনে এই আস্থা ফেরানোর কতোটা প্রয়োজন তার উপলব্ধিতে বরং শিয়ালদা কোর্টের বিচার শেষের বিন্দু থেকে দীর্ঘ পথ চলা শুরু হোক। আর জি কর অপরাধ কান্ডের বিচার চেয়ে কলকাতায় অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে দিল দেশ জুড়ে । কর্মস্থলে নিরাপত্তা পেতে সুরক্ষিত থাকতে কয়েক দফা দাবীতে সেই আন্দোলনের রেশ এখনও জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনে জেগে রয়েছে। জুনিয়র চিকিৎসকরা যে সমস্ত দাবি গুলি তুলেছেন তার মধ্যে রয়েছে, কর্মস্থলে সর্বত্র সিসিটিভি ক্যামেরা, রাতে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য নির্দিষ্ট ঘর, কর্মরত জুনিয়র চিকিৎসকদের জন্য দিনে রাতে যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার মতো দাবি গুলি। আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরা তাঁদের দাবি গুলি পশ্চিম বঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবা কে কেন্দ্র করে তুললেও তা কি দেশের যে কোনো শহরের স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রের ছবি কে প্রতিফলিত করে না? বিশেষতঃ যেখানে মেয়েদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সারা দেশে ই আমরা প্রতিশ্রুতি আর কাজের মধ্যে এক আকাশ, এক সমুদ্র দূরত্ব দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। নির্ভয়া তহবিলের দিকে চোখ রাখলেই বিষয় টা আরও স্পষ্ট হবে। মেয়েদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করতে ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার এই জাতীয় তহবিল গঠন করে। অথচ পরিসংখ্যান বলছে ওই বছর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই তহবিলে বরাদ্দ অর্থের অর্ধেক ও খরচ হয় নি। ২০২৪-২০২৫ সালের বাজেটে কেন্দ্র এই তহবিলে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ১০০ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলেছে । তার কতটা এখনও পর্যন্ত ব্যায় হয়েছে সেই পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। আর জি কর অপরাধ কান্ডের পরে রাজ্যে Aparajita woman and child (West Bengal criminal laws and amendment) bill 2024 পাস হয়েছে। এই আইনে দ্রুত বিচার ও অপরাধীর ফাঁসির সাজার সুপারিশ রয়েছে। তবে ঘরে বাইরে মেয়েদের নিরাপদ রাখতে কড়া আইনের পরেও অনেকটা পথ চলার প্রয়োজনীয়তা থেকে যায়। পশ্চিমবঙ্গে নারী উন্নয়নের প্রশ্নকে অগ্ৰাধিকার দেওয়ার অতীত ঐতিহ্য রয়েছে। মহিলা ভোটার রাজ্যের তৃণমূল সরকারের এক অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। মহিলাদের কল্যাণে লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্প চালু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংসদে তৃণমূলের ই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মহিলা প্রতিনিধি রয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে আমরা তো আশা করতেই পারি প্রতিশ্রুতি আর কাজের মধ্যে দুরত্ব কমাতে চলবে রাজ্য প্রশাসন। নারী ক্ষমতায়ন এবং সমানাধিকারের প্রতিশ্রুতি পালনে প্রশাসন ও সমাজের দ্বায়িত্ব পূরনের সময় পার হতে বসেছে। নগর পরিকল্পনায় মহিলা নিরাপত্তার নকশা এবং নীতির বড়ই প্রয়োজন। নিহত চিকিৎসক তরুনীর বাবা মা র উদ্দেশে শিয়ালদা কোর্টের বিচারক বলেছেন,”আপনাদের মেয়ে সেদিন রাতে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তাকে নিরাপদ রাখার দ্বায়িত্ব ছিল রাজ্যের”। বিচারকের এই পর্যবেক্ষণ নিশ্চয়ই প্রশাসনের কানেও পৌঁছেছে। এই পর্যবেক্ষণের মধ্যে যে বার্তা রয়েছে তা হল নিরাপত্তাহীনতায় মেয়েদের চলনে আর যাই থাক স্বাধীনতা থাকে না।