Deleted Voters Movement in Bengal
বিশেষ প্রতিবেদন:
প্রতীকি ছবি
আজ বাংলার আকাশ-বাতাস এক হাহাকারে ভারী হয়ে উঠেছে। যে প্রশ্ন আজ বাংলার লাখ লাখ ‘ডিলিটেড’ ভোটার তুলছেন, সেই আর্তনাদ কি পৌঁছাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের কানে?
যুদ্ধের দামামা না কি গণতন্ত্রের উৎসব?
দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার আজ পশ্চিমবঙ্গকে এক রণক্ষেত্রে পরিণত করেছেন। প্রতিদিন তাঁর গলায় শোনা যাচ্ছে হুঙ্কার। কিন্তু গণতন্ত্র তো শক্তির আস্ফালন নয়, গণতন্ত্র হলো মানুষের অধিকার। সংবিধান প্রণেতা ড. বি.আর. আম্বেদকর বলেছিলেন, “ভোটাধিকার কোনো দয়া বা উপহার নয়, এটি একটি শক্তিশালী অস্ত্র। যদি কোনো নাগরিকের এই অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তবে তাকে রাজনৈতিকভাবে দাসত্বের শিকলে বেঁধে ফেলা হয়।” আজ বাংলার প্রান্তিক শ্রেণির, বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চাওয়ার অর্থ কি তবে তাঁদের সেই দাসত্বের দিকেই ঠেলে দেওয়া? এই জবাব কি কমিশন দেবে না?
রাজনীতির দাবার ঘুঁটি যখন সাধারণ মানুষ
দুর্ভাগ্য আমাদের, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী—জনগণের এই প্রবল ক্ষোভ প্রশমিত করার বদলে কেউ বলছেন ‘উঁইপোকা’, আবার কারও গলায় শোনা যাচ্ছে দাঙ্গার স্মৃতিচারণ। আসলে বেপরোয়া জনতার মনে যে প্রবল ভীতির সঞ্চার হয়েছে, তা দূর করার দায়ভার কি কারও নেই? দেশের সর্বোচ্চ আদালত আশ্বস্ত করেছেন যে, এবার ভোট দিতে না পারা মানেই সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু প্রশ্নটা তো মৌলিক—কেন আজ বাংলার অতি সাধারণ মানুষকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির’ নামে গিনিপিগ বানানো হচ্ছে?
বিচার ও অবিচারের দোলাচলে অসহায় প্রাণ
যাদের দুবেলা অন্নসংস্থান করতেই রাতে ঘুম উবে যায়, সেই সব ডিলিটেড ভোটাররা দূরবর্তী জেলা থেকে কলকাতায় এসে উকিল ধরে ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হতে পারবেন—এমন ভাবাটাই কি নিষ্ঠুরতা নয়? এই গভীর হতাশা থেকেই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। আর সেই সুযোগে কিছু মতলববাজ মানুষের বিচারব্যবস্থাকে, বিচারপতিদের আটক করে হেনস্তা করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয়। যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের সাজা হোক, কিন্তু যারা কেবল নিজের অধিকার রক্ষায় দিশেহারা হয়ে পথে নেমেছে, তাদের হাহাকার কি শোনা যাবে না?
ক্ষমতার দম্ভ বনাম শেষনের আদর্শ
ভারতের নির্বাচনী সংস্কারের পথপ্রদর্শক টি.এন. শেষন বলতেন, “নির্বাচন কমিশন জনগণের ভৃত্য, কোনো শক্তির লাঠিয়াল নয়। ভোটের সফলতা বন্দুকে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সেই আস্থায় নিহিত থাকে যেখানে একজন দরিদ্রতম মানুষও কোনো ভয় ছাড়াই নিজের রায় দিতে পারেন।” বর্তমান কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সমস্যার গভীরে না গিয়ে শুধু আধিকারিকদের হুঙ্কার দিচ্ছেন। লাঠি, গুলি আর বন্দুকের শাসনে হয়তো ‘শান্তিপূর্ণ’ ভোটের তকমা পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের মন জয় করা যায় না।
ক্ষমতার দম্ভে আজ হয়তো অনেকেই ভুলে গেছেন যে, গণতন্ত্রে মানুষই শেষ কথা বলে। যারা আজ সাধারণের চোখের জল আর অধিকারহীনতাকে অস্বীকার করছেন, ইতিহাসের অমক নিয়মে তাঁদের চরম মূল্য দিতেই হবে। মানুষের রায় যখন গর্জে ওঠে, তখন কোনো হুঙ্কারই কাজে আসে না।
