নিজের মাটিতেই ‘পরবাসী’: এক বুক কান্না আর সুপ্রিম কোর্টে ঐতিহাসিক জয়

Supreme Court HistoricVerdict

নিজস্ব প্রতিবেদন :

সুপ্রিম কোর্ট বাংলার মানুষের পক্ষে এত বড়, এত ঐতিহাসিক একটা রায় ঘোষণা করল—অথচ আমাদের বাংলার তথাকথিত বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরের শিরোনাম তো দূরের কথা, মূল খবরের তালিকাতেও এর জায়গা হলো না! কতটা দুর্ভাগ্যজনক হলে নিজেদের মানুষের এই চরম লড়াইয়ের গল্পকে এভাবে আড়াল করে রাখা যায়?

অপরাধটা ঠিক কী ছিল জানেন? অপরাধ ছিল—তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন। হ্যাঁ, শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ দেশের রাজধানী দিল্লি থেকে বীরভূমের পাঁচটি প্রাণকে রাতারাতি ‘বাংলাদেশী’ তকমা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এক লহমায় চেনা পৃথিবীটার ওপারে, পুশব্যাক করা হয়েছিল বাংলাদেশে। নিজেদের দেশে, নিজেদের ভিটেমাটিতে দাঁড়িয়েও তাঁরা এক নিমেষে হয়ে গেলেন পরিচয়হীন, দেশহারা।

আজ দীর্ঘ, রক্তাক্ত এক আইনি লড়াইয়ের পর এল সেই বহু প্রতীক্ষিত বিচার। কয়েক মাস আগে দু’জন ফিরলেও, বাকি থাকা শেষ তিনজনকে অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে আনার চূড়ান্ত নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। সত্যের জয় হলো, জয় হলো মানবিকতার।

সেই অভিশপ্ত রাত এবং এক গর্ভবতী মায়ের আর্তনাদ

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে বীরভূমের সেই অন্তঃসত্ত্বা সুনালী খাতুন, তাঁর স্বামী দানিশ শেখ আর তাঁদের নিষ্পাপ শিশুপুত্রের কথা? মনে আছে সুইটি বিবি আর তাঁর দুই নাবালক সন্তানের কথা?

দিনটা ছিল ২৭শে জুন, ২০২৫। রাতের অন্ধকারে দিল্লি পুলিশ সোনালি, তাঁর স্বামী দানিশ ও তাঁদের সন্তানসহ বাকিদের জোরপূর্বক অবৈধ প্রবাসী বলে দাবি করে। অথচ তাঁদের কাছে আধার কার্ডসহ সমস্ত ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও, কোনো প্রমাণের তোয়াক্কা না করে তাঁদের পুশব্যাক করা হয়।

সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে তাঁদের ফিরিয়ে আনতে, তাঁদের হৃত সম্মান পুনরুদ্ধার করতে বুক চিতিয়ে আইনি লড়াইয়ে নামেন তৃণমূল সাংসদ সামিরুল ইসলাম। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত—লড়াইয়ের রাস্তাটা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। মূলত তাঁরই অক্লান্ত জেদ আর লড়াইয়ের ওপর ভর করে আজ এই পরিবারগুলো আবার নিজেদের মাটির গন্ধ বুকে টেনে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

টুকরো হয়ে যাওয়া পরিবার এবং এক পরাধীন জন্ম

লড়াইয়ের প্রথম বড় সাফল্য এসেছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। সুপ্রিম কোর্টের কড়া হস্তক্ষেপে মালদার মহদীপুর সীমান্ত দিয়ে নিজের আট বছরের সন্তানকে কোলে নিয়ে ভারতে ফিরে এসেছিলেন নয় মাসের গর্ভবতী সুনালী খাতুন। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! সেই সময় তাঁর সঙ্গে ফিরতে দেওয়া হয়নি তাঁর স্বামী দানিশ শেখকে। ফেরানো হয়নি সুইটি বিবি ও তাঁর দুই নাবালক সন্তানকেও।

একটা বুকফাটা হাহাকার নিয়ে সুনালী বীরভূমে ফিরে আসেন। আর এখানেই, স্বামীর অনুপস্থিতিতে, একরাশ শূন্যতা আর চোখের জল সাক্ষী রেখে তিনি জন্ম দেন তাঁর দ্বিতীয় সন্তানের। যে শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখল, সে জানতও না তার বাবা সীমান্তপারের এক বন্দিশালায় দিন গুনছেন।

অবশেষে বিচারের সূর্যোদয়: সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

অবশেষে এই শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চে যখন সুনালী ও সুইটি বিবির আত্মীয়দের দায়ের করা পিটিশনের শুনানি শুরু হয়, তখন আদালত এই ‘পুশ-ব্যাক’-এর অমানবিক বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে।

শুনানি চলাকালীন কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল আদালতকে স্পষ্ট জানান যে, এই মামলার বিশেষ মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে উভয় মামলায় নাম থাকা সমস্ত ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের সসম্মানে ভারতে ফিরিয়ে আনা হবে। দেশে ফেরার পর নিয়মমাফিক তাঁদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে। সর্বোচ্চ আদালত অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে কেন্দ্র সরকারকে এঁদের সবাইকে নিজেদের দেশে, নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনতেই হবে।

এই ঐতিহাসিক জয়ের পর আবেগঘন কণ্ঠে সাংসদ সামিরুল ইসলাম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন:

“এটি এমন একটি চ্যালেঞ্জ ছিল যা আমরা অনেক আগেই বুক দিয়ে গ্রহণ করেছিলাম। আমরা সেই সমস্ত অসহায় পরিবারগুলোর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম যাদের সব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল… আজ প্রমাণিত হলো, শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়।”

রাজনীতি, কাঁটাতার আর আইনি মারপ্যাঁচের ঊর্ধ্বে গিয়ে এই জয় আসলে একটা ছেঁড়া পরিবার জুড়তে পারার জয়। এই জয় এক নবজাতকের তার বাবার কোলে ফিরে পাওয়ার অধিকারের জয়। বাংলার মানুষের আত্মপরিচয়ের জয়!