The joining of the BJP by three former Trinamool Congress Rajya Sabha MPs and some questions.
বিশেষ প্রতিবেদন-
রাজনীতি—শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘রাজার নীতি’, যার গভীরে নিহিত থাকার কথা নৈতিকতা, আদর্শ এবং সমাজকে পথ দেখানোর এক অমোঘ অঙ্গীকার। রাজনীতি মানে নতুন প্রজন্মের সামনে নিজেকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা। কিন্তু বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই শব্দটির অর্থ যেন কেবলই ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকার এক নির্লজ্জ সুবিধাবাদে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলায় যে দলত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে, তা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন নৈতিক অধঃপতনের দলিল।
আজ বাংলার রাজনীতি ফের এক অদ্ভুত ও নির্লজ্জ ভোলবদলের সাক্ষী হলো। তৃণমূল কংগ্রেসের তিন প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ—সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক—যাঁরা একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন, তাঁরাই আজ ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পতাকা হাতে তুলে নিলেন। যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন নিজ হাতে এঁদের ক্ষমতার শীর্ষে বসিয়েছিলেন, আজ দলের এই চরম দুর্দিনে তিনিই যেন এঁদের কাছে সবচেয়ে বড় ‘বোঝা’।
DEEP FACT: রাজনৈতিক অতীত, সংসদে ভূমিকা এবং বিরোধী সত্তার মৃত্যু
এই তিন সাংসদের রাজনৈতিক উত্থান ও অতীত বিশ্লেষণ করলে তাঁদের বর্তমান দলবদলের পেছনের চরম আদর্শহীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
- সুখেন্দু শেখর রায়: দীর্ঘদিনের কংগ্রেসি রাজনীতি থেকে তৃণমূলে আসা এই প্রবীণ নেতা ছিলেন রাজ্যসভায় তৃণমূলের অন্যতম প্রধান মুখ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতি বিশ্বস্ত সেনাপতি। আর জি কর কাণ্ডের সময় ক্ষণিকের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুললেও, পরে সুর নরম করে তিনি তৃণমূলেই থেকে গিয়েছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সুখেন্দু শেখর রায়ই সংসদে দাঁড়িয়ে আরএসএস, নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানাতেন। তাঁর সেই জ্বালাময়ী অ্যান্টি-বিজেপি বক্তৃতা আজ ক্ষমতার লোভে স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
- সুস্মিতা দেব: সর্বভারতীয় রাজনীতিতে একসময় ‘রাহুল গান্ধী ব্রিগেড’-এর অন্যতম চর্চিত মুখ ছিলেন সুস্মিতা। তাঁর বাবা প্রয়াত সন্তোষ মোহন দেব আমৃত্যু কংগ্রেসে ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়েছিলেন। কংগ্রেসের সেই ঐতিহ্যবাহী ঘরানা ছেড়ে সুস্মিতা যখন তৃণমূলে এলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে পরম স্নেহে দু-দুবার রাজ্যসভার সাংসদ করে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছিলেন। সংসদে নারী অধিকার ও বিজেপি বিরোধিতায় তিনি ছিলেন তৃণমূলের অন্যতম জোরালো কণ্ঠস্বর। আজ সেই কণ্ঠস্বরই বিজেপির জয়ধ্বনি দিচ্ছে।
- প্রকাশ চিক বরাইক: আলিপুরদুয়ারের সাধারণ চা-বাগান শ্রমিক সংগঠন থেকে উঠে আসা এক তৃণমূল স্তরের নেতা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান পদাধিকারী করেন এবং মাটি থেকে তুলে এনে সোজা রাজ্যসভার সাংসদ করে গোটা রাজ্যকে চমকে দিয়েছিলেন। যে নেত্রী তাঁকে এই অকল্পনীয় রাজনৈতিক উত্থান উপহার দিয়েছিলেন, আজ ক্ষমতার স্বাদ বজায় রাখতে তিনি সেই নেত্রীরই হাত ছাড়লেন।
কৃতঘ্নতার রাজনীতি ও বাংলার ভাবমূর্তির সংকট
যাঁরা একদিন সংসদে দাঁড়িয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে আগুন ঝরাতেন, আজ তাঁরাই সেই দলের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। রাজনীতিতে দলবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু দুর্দিনে যে নেত্রীর হাত ধরে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা, তাঁকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধেই প্রকাশ্যে বিষোদগার করে ক্ষমতা ধরে রাখার এই প্রয়াস বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন নিম্নগামী নজির। যিনি এই দলটিকে শূন্য থেকে শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং এত মানুষকে ক্ষমতার স্বাদ দিয়েছিলেন, আজ তিনি একাকী। ডুবন্ত নৌকা থেকে ইঁদুরের মতো সবার আগে ঝাঁপ দেওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, এঁদের কাছে কোনো আদর্শ বা নীতি নেই, আছে কেবল ক্ষমতার অন্ধ মোহ।
আদর্শহীন এই নেতাদের দেখে বাংলার সাধারণ মানুষ আজ হতবাক। নতুন প্রজন্মের কাছে এঁরা কী দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন? গোটা দেশের সামনে বাংলার এই তথাকথিত নেতারা প্রমাণ করছেন যে, বাংলার মাটি থেকে জন্ম নেওয়া নীতিবোধ আজ কেবলই প্রহসন। এই রাজনৈতিক দৈন্যতা বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও বাংলার রাজনীতিকে গোটা দেশের সামনে ক্রমশ বামন করে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।
