Freedom of expression is the foundation of democracy” – Taslima Nasrin
কলকাতা: দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে বাংলা অ্যাকাডেমিতে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে একাধিক বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। রাজনীতি, ধর্ম, নারী অধিকার থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য নতুন করে চর্চা শুরু করেছে।
প্রসঙ্গ: মাদ্রাসা ও শিক্ষার রূপান্তর
মাদ্রাসা শিক্ষা প্রসঙ্গে অত্যন্ত কড়া মন্তব্য করেন লেখিকা। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মাদ্রাসা সম্পর্কে যা জানি, সেগুলির থাকা উচিত নয়। সেখানে জেহাদি তৈরি হচ্ছে। মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ, নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ইমাম, শিক্ষকরা ধরা পড়ছে। শুধু তো শাস্তি দিলে হয় না, মাদ্রাসার কোনও দরকার আছে? মাদ্রাসা থেকে পাশ করে কেউ কিছু করে না, ভিক্ষে করে খায়।”তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সব মাদ্রাসাগুলিকে বন্ধ করে সেকুলার ( ধর্মনিরপেক্ষ) স্কুলে রূপান্তর করা উচিত। রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণের ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশের সরকারের উচিত মসজিদ ও মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করা। তসলিমার কথায়, “সরকার নিজে থেকে ধর্ম প্রচার করবে না। রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।”
প্রসঙ্গ: অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code)
তসলিমা নাসরিন অভিন্ন দেওয়ানি বিধির (UCC) পক্ষে জোর সওয়াল করেন। তিনি জানান, সমান অধিকারের ভিত্তিতে একটি দেশের সকল নাগরিকের জন্য একই আইন থাকা উচিত। তাঁর মতে, শুধু ভারতেই নয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা প্রয়োজন। “এক দেশ, এক আইন” নীতি চালু হলে সমাজে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রসঙ্গ: মৌলবাদ, বাকস্বাধীনতা ও রাজ্য রাজনীতি
কলকাতায় ফেরা নিয়ে বাম, তৃণমূল এবং বিজেপি—এই তিন সরকারের পার্থক্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তসলিমা বলেন, “এক সরকার আমাকে বের করে দিয়েছিল। আরেক সরকার আমায় আসতে দেয়নি। আরেক সরকার আমাকে আসতে দিয়েছে। এই পার্থক্য না-দেখে এই যে আমি আসতে পারলাম, সেটাকে সেলিব্রেট করা উচিত।”তিনি আশা প্রকাশ করেন যে বর্তমান সরকার বাকস্বাধীনতা ও ভিন্ন মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় বিশ্বাস করে। নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানান, প্রগতিশীল মুসলিম সংগঠন ‘সেকুলার মিশন ট্রাস্ট’-এর আমন্ত্রণে তিনি এসেছেন এবং তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার মধ্যে কোনো রাজনীতি নেই। যে সরকারই নিরাপত্তা দিক না কেন, তিনি তাঁর আদর্শ এবং চিন্তাধারায় অবিচল থাকবেন।
প্রসঙ্গ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ছাত্র আন্দোলন
সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তসলিমা বলেন, “বাংলাদেশের সেই ছাত্র আন্দোলন চব্বিশে আমাদের বোকা বানিয়েছিল।” কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনটি প্রথমে ন্যায্য মনে হলেও পরবর্তীতে তা ভিন্ন খাতে বয়ে যায় বলে তাঁর দাবি। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার পতনের এই আন্দোলনের নেপথ্যে জেহাদিদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল এবং তারাই পরে দেশ দখল করেছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নানা নীতির সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ বা দেশছাড়া করা কখনোই গণতান্ত্রিক কাজ হতে পারে না।
প্রসঙ্গ: সংখ্যালঘু অধিকার ও ধর্মীয় মৌলবাদ
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ধারাবাহিক অত্যাচারের তীব্র নিন্দা জানান লেখিকা। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান, এরশাদ বা শেখ হাসিনার আমল থেকে শুরু করে বর্তমান ইউনূস সরকার—প্রতিটি আমলেই হিন্দুরা অত্যাচারিত হয়েছেন, তবে বর্তমানে এর মাত্রা আরও বেড়েছে। সনাতনী নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হিন্দুরা সংগঠিত হয়েছেন বলেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি জামাত-ই-ইসলামী প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তসলিমা বলেন, “এরা ক্ষমতায় এলে সপ্তম শতাব্দীর শরিয়া আইন কায়েম হবে, যা নারী ও সংখ্যালঘুদের জন্য চরম ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।”
প্রসঙ্গ: নারী অধিকার ও সামাজিক বৈষম্য
বাংলাদেশ ও ভারতের নারীদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তসলিমা বলেন, বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রে হিন্দু নারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং পদে পদে বৈষম্যের শিকার হন। একইভাবে ভারতের মুসলিম নারীরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা বৈষম্যের মুখোমুখি হন। যেকোনো ধর্মের অনুশাসন ছাপিয়ে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের দাবিতে তাঁর এই লড়াই ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গ: কবি জয় গোস্বামী বিতর্ক ও কলকাতা বইমেলা
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিতর্ক প্রসঙ্গে কবি জয় গোস্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে তসলিমা বলেন, “তাঁকে অসম্মান করা মানে আমাকেও অসম্মান করা।” তিনিই জয় গোস্বামীকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনে নিজে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করবেন বলে জানান। এ ছাড়া, ভবিষ্যতে কলকাতা বইমেলায় অংশ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি জানান, রাজ্য সরকার যথাযথ নিরাপত্তা দিলে তিনি আগের মতোই মেলায় যাবেন। ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে দুই দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
