Crisis of Ideology in Bengal’s Politics
বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলার রাজপথে আজ নীতি এবং নৈতিকতা শব্দ দুটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি নিঃসঙ্গ। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে এসে বাংলা এমন এক অভূতপূর্ব ও কদর্য রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি, যেখানে নীতিদর্শনের চেয়ে ক্ষমতার সমীকরণ এবং দুর্নীতি আড়ালের তাগিদ অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একদিকে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলে তৃণমূলের অস্তিত্ব সংকটের মুখে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও আদর্শগত নৈতিকতা হারিয়ে বঙ্গ বিজেপিও আজ এক গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত।
তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষস্তরের ভাঙন, নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-র উত্থান এবং মঙ্গলবার দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দলবদলু ২০ জন সাংসদের ‘সৌজন্য’ সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে যে ছবিটা ফুটে উঠছে, তা বস্তুত নাম কা ওয়াস্তে একটি নতুন দলের গল্প। আড়ালে চিত্রনাট্যটি স্পষ্ট: অলিখিতভাবে এরা সকলেই আজ বিজেপির ও এনডিএ-র পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে। কদিন আগে এনডিএ-র ‘মঙ্গল মিলন’ বৈঠকে যোগ দেওয়া থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাসিমুখে ছবি তোলা—বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে ক্ষমতার আসল কেন্দ্রে তাঁরা কতখানি ঘনিষ্ঠ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এককালের অতিবিশ্বস্ত সহযোদ্ধারা আজ নিজেদের ‘পিঠ বাঁচাতে’ এবং ক্ষমতার মধুর স্বাদ বজায় রাখতে রাতারাতি রং বদলে ফেলেছেন।
তবে এই পরিবর্তনের স্রোতে বঙ্গ বিজেপি বিপুল জয় পেলেও সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকটের মুখে গিয়ে পড়েছে তাদের নিজেদেরই নিচু তলার কর্মী ও সমর্থকেরা। যে কর্মীরা বছরের পর বছর মাঠ-ঘাটে রক্ত ঝরিয়েছেন, ‘চোর ধরো, জেল ভরো’ শ্লোগানে গলা ফাটিয়েছেন এবং চরম অত্যাচার সহ্য করে তৃণমূলকে ক্ষমতার মসনদ থেকে সরাতে লড়েছেন, আজ তাঁদেরই বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হচ্ছে সেই পুরোনো ‘দলবদলু’ মুখদের। কাল পর্যন্ত যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সরব ছিলেন, আজ তাঁদেরই শুভেন্দু অধিকারীর ‘নিশ্চিন্ত ছায়ায়’ আশ্রয় নিতে দেখে নিচুতলার কর্মীদের মানসিক যন্ত্রণা আজ চরমে। নীতিহীনতার এই খেলায় আসল লড়াই করা কর্মীদের ক্ষোভ আর অসহায়তা আজ স্পষ্ট।
অবশ্য এই রামধনু জোটের অন্দরমহলেও ফাটল স্পষ্ট। মুর্শিদাবাদের দুই সাংসদ আবু তাহের ও খলিলুর রহমান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এনসিপিআই-তে থাকলেও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় টিকে থাকার স্বার্থে এনডিএ বা বিজেপির ছাতায় থাকা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে, কালীঘাট ক্যাম্পের অনুগতদের আনাগোনার জল্পনা এবং পাল্টা বিধায়ক ধরে রাখার দাবি—সব মিলিয়ে রাজনীতি আজ কেবলই সংখ্যাতত্ত্ব ও সুবিধাবাদের খেলায় পরিণত হয়েছে।
ক্ষমতার অলিন্দে থাকা নেতাদের জন্য এই পরিবর্তন হয়তো সুচতুর কৌশল হতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে আজকের এই নীতিলীন রাজনীতি নিছকই এক করুণ উপহাস। দুর্নীতিমুক্ত ও কলঙ্কমুক্ত বাংলার যে স্বপ্ন ৯০ দিনের ব্যবধানে আজ ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে বসেছে, তা রাজনীতির নৈতিক দেউলিয়াপনাকেই নগ্ন করে দেয়। বাংলার ইতিহাসে এমন অন্ধকার ও নীতিহীন অধ্যায় এর আগে সচরাচর দেখা যায়নি।
