Internal BJP debate over Netaji
বিশেষ প্রতিবেদন:
বঙ্গ রাজনীতির আকাশ-বাতাস আজ এক ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক আলোড়নে মুখরিত। একদিকে প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় ‘নেতাজি সেবাকেন্দ্র’ খোলার প্রশাসনিক তোড়জোড়, অন্যদিকে সাইবার সেল ও পুলিশকে পাশে বসিয়ে নবান্ন থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া হুঁশিয়ারি—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিন্দুমাত্র অপপ্রচার বা কুৎসা বরদাস্ত করা হবে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় অবমাননাকর মন্তব্যকারীদের বিরুদ্ধে জামিনঅযোগ্য ধারায় গ্রেফতারির স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তবে এই প্রশাসনিক কঠোরতার নেপথ্যে উঁকি দিচ্ছে বঙ্গ রাজনীতির এক পরম সত্য: বাঙালি মানসে নেতাজির স্থান স্পর্শকাতরতার শীর্ষস্থানে, যেখানে আঘাত লাগলে রাজনৈতিক মাসুল হতে পারে মারাত্মক।
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের (নাগেন্দ্র রায়) নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দেওয়া ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অবদানকে খাটো করার চেষ্টা, কিংবা বীরভূমের রামপুরহাটে ‘নেতাজি সুভাষ রোড’-এর নাম বদলে ‘ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী’ ফলক বসানোর মতো ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে আজ রাজ্যের শাসক থেকে বিরোধী—সব পক্ষই কাঠগড়ায় তুলছে গেরুয়া শিবিরকে। প্রশ্ন উঠছে, ঐতিহাসিক আদর্শের সংঘাত উস্কে দিয়ে বিজেপি কি বাংলায় নিজেদেরই পথ কঠিন করে তুলছে?
ইতিহাসের সেই কালিমালিপ্ত শিক্ষা: বামপন্থীদের ‘তোজোর কুকুর’ বিতর্ক
বাংলার রাজনীতিতে মণীষীদের অপমান করে টিকে থাকা যে অসম্ভব, তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ অবিভক্ত সিপিআই (পরবর্তীকালে সিপিআইএম)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যখন আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন, তখন বামপন্থী মিডিয়া ও নেতারা তাঁকে ‘তোজোর কুকুর’ (জাপানের তোজো সরকারের অনুগত) বলে আক্রমণ করেছিলেন। এমনকি ব্যঙ্গচিত্র এঁকে নেতাজিকে অপমান করার সেই সিদ্ধান্ত ছিল ঐতিহাসিক ভুল।
পরবর্তীকালে জ্যোতি বসু থেকে শুরু করে সুকোমল সেনের মতো বহু বামপন্থী শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, নেতাজির মহাকাব্যিক অবদানকে বুঝতে না পারা এবং তাঁকে কটু আক্রমণ করা তাঁদের দলের সবচেয়ে বড় ‘ঐতিহাসিক ভুল’ ছিল। স্বাধীনতার চার দশক পরও বাংলার সাধারণ মানুষ সেই অপমান ভুলতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, সত্তরের দশকে বামপন্থীরা ক্ষমতায় এলেও ‘নেতাজি-বিরোধী’ সেই তকমা কাটাতে তাঁদের কয়েক দশক ঘাম ঝরাতে হয়েছিল এবং আজও বাঙালি আবেগ সেই ভুলের ক্ষমা পুরোপুরি দেয়নি।
শ্যামাপ্রসাদ বনাম সুভাষচন্দ্র: বিজেপির আদর্শগত দ্বন্দ্ব ও আসল কারণ
আজ বিজেপি যেভাবে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে বঙ্গ রাজনীতির মূল স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, ঠিক সেখানেই সংঘাত বাঁধছে নেতাজির সর্বজনগ্রাহ্য ভাবমূর্তির সঙ্গে।
১. হিন্দুত্ববাদী আইকন বনাম ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ:
ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা এবং হিন্দু মহাসভার তৎকালীন নেতা ছিলেন। বিজেপি বাংলায় তাদের শিকড় মজবুত করতে শ্যামাপ্রসাদকে প্রধান ‘ভূমিপুত্র আইকন’ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৪০-এর দশকে কলকাতা পুরসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে সামগ্রিক রাজনীতিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কঠোর বিরোধী ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসু। হিন্দু মহাসভার আদর্শের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নেতাজি এক অখণ্ড, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
২. আঞ্চলিক সমীকরণ ও ভোটব্যাংকের রাজনীতি:
কোচবিহারের রাজ্যসভা সাংসদ অনন্ত মহারাজ উত্তরবঙ্গে নিজস্ব ‘রাজবংশী’ ও পৃথক রাজ্য সমর্থক সংগঠনের (GCPA) আবেগ ভাঙিয়ে রাজনীতি করেন। রাজবংশী ভোটব্যাংক ধরে রাখতে অনন্ত মহারাজের প্রান্তিক ও বিতর্কিত মন্তব্যকে শুরু থেকেই বিজেপি কেন্দ্রীয়ভাবে কড়াভাবে দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে। একদিকে উত্তরবঙ্গের স্থানীয় মেরুকরণ বজায় রাখা, আর অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদকে নেতাজির সমকক্ষ বা তাঁর চেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী প্রমান করার প্রবণতাই এই বিভ্রাটের মূল কারণ।
বাংলায় কতটা বেগ পেতে হবে গেরুয়া শিবিরকে?
বাঙালি হিন্দু সমাজ রবিঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু—এই তিন ব্যক্তিত্বকে রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখে। বিজেপি যখন জাতীয় স্তরে ২৩ জানুয়ারিকে ‘পরাক্রম দিবস’ ঘোষণা করছে বা কর্তব্যপথে নেতাজির মূর্তি বসাচ্ছে,তখন রাজ্য বিজেপির এক অংশের এই অবিবেচক মন্তব্য ও ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা সেই সমস্ত ইতিবাচক পদক্ষেপকে এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
রামপুরহাটে নেতাজি রোডের নাম বদলের প্রচেষ্টা কিংবা প্রকাশ্য জনসভায় ফরওয়ার্ড ব্লককে ‘গুন্ডা’ ও নেতাজিকে নিয়ে কটূক্তি করার মাশুল বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে চড়া দামেই দিতে হতে পারে।
বাঙালির মণীষী-আবেগে আঘাত দেওয়া মানেই আত্মঘাতী রাজনীতি। সিপিআইএম যে ভুলের মাসুল চার দশক ধরে গুনেছে, গেরুয়া শিবিরের একাংশ যদি শ্যামাপ্রসাদকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদে নেতাজির ঐতিহাসিক অবদানকে ধোঁয়াশাতে পাঠাতে চায়, তবে বাংলার মাটি তাদের ক্ষমা করবে না। নবান্ন থেকে শুভেন্দু অধিকারীর কড়া অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, নেতাজিকে নিয়ে রাজনীতি বা অপপ্রচার বঙ্গ রাজনীতির সবচেয়ে বড় স্পর্শকাতর রেখা—আর সেই রেখা অতিক্রম করলে আগামী দিনে বঙ্গ বিজেপিকে বড় মাসুল দিতে হবে।
