এআই নির্মিত ছবি
Changes are set to be introduced to the rules governing Muslim marriages in Uttarakhand.
বিশেষ প্রতিবেদন
দেহরাদূন: উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) কার্যকর হওয়ার পর এবার মুসলিম বিয়ের নিয়মেও বড়সড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। রাজ্যের মুসলিম বিবাহের প্রচলিত ‘নিকাহনামা’য় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য ওয়াক্ফ বোর্ড। ইউসিসির আইনের সাথে মিল রেখে আগামী এক মাসের মধ্যে একটি নতুন সংশোধিত নিকাহনামা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবিত খসড়া নিয়ে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ইউসিসি প্যানেলের বিশেষজ্ঞদের সাথে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বিয়ের কলাম বাদ
ওয়াক্ফ বোর্ডের চেয়ারম্যান শাদাব শামস জানিয়েছেন, নতুন নিকাহনামায় একাধিক বিয়ের সুযোগ আর থাকছে না। পুরোনো নিকাহনামায় দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বিবাহের জন্য পৃথক যে কলাম বা ঘর থাকত, তা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন নথিতে শুধুমাত্র একটিমাত্র বিবাহের ব্যবস্থাই থাকবে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি উত্তরাখণ্ডে ইউসিসি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই রাজ্যে বহুবিবাহ আইনিভাবে নিষিদ্ধ হয়েছে।
নিকাহ সম্পাদন ও নিবন্ধনে কড়া নিয়ম
প্রস্তাবিত পরিবর্তন শুধু বিয়ের সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বিয়ে সম্পাদন ও নথিবদ্ধ করার প্রক্রিয়াতেও বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে:
- নিবন্ধিত আলেম বা কাজি: এখন থেকে কেবল সরকারি অনুমোদিত বা নিবন্ধিত কাজিরাই নিকাহ সম্পাদন করতে পারবেন। তাঁদের জন্য একটি বিশেষ রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকবে।
- সত্যপাঠ বা হলফনামা: বিয়ে করার আগে বর ও কনেকে একটি আনুষ্ঠানিক হলফনামা জমা দিতে হবে, যার মাধ্যমে তাঁদের বর্তমান বৈবাহিক অবস্থা স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা যাবে।
- ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন: ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিকাহ হওয়ার পর ৬০ দিনের মধ্যে সরকারিভাবে বিয়ে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উত্তরাখণ্ডের ইউসিসি অনুযায়ী, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্যই এই নিয়ম প্রযোজ্য।
হালালা ও ইদ্দত প্রথায় ইতি
প্রস্তাবিত নতুন নিকাহনামায় ‘হালালা’ ও ‘ইদ্দত’-এর মতো প্রচলিত প্রথাগুলিকেও বাতিল করার বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। উত্তরাখণ্ডের ইউসিসিতে ইতিমধ্যেই বহুবিবাহ, হালালা, তাৎক্ষণিক তিন তালাক ও ইদ্দত প্রথাকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, ইউসিসি কার্যকর হওয়ার পর থেকে রাজ্যে এ জাতীয় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার মামলা সামনে আসেনি।
ধর্মান্তর ও বিয়ের আইনি কাঠামো
আন্তঃধর্মীয় বিয়ের ক্ষেত্রে ধর্মান্তরকে সম্পূর্ণ আলাদা আইনি বিষয় হিসেবে ধরা হবে। কেবল বিয়ের খাতিরে ধর্ম পরিবর্তন করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হতে চান, তবে উত্তরাখণ্ডের ধর্মান্তর-বিরোধী আইনের নির্দিষ্ট আইনি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। রাজ্য প্রশাসনের স্পষ্ট বার্তা, যেকোনো আন্তঃধর্মীয় বিয়ে মানেই জোরপূর্বক ধর্মান্তর নয়; বিষয়টি স্বেচ্ছায় নাকি কোনো চাপ বা প্রলোভনে হয়েছে—আইন কেবল সেটুকুই যাচাই করবে।
সরকারি ছাপ ও নতুন স্বচ্ছতা
নতুন নিকাহনামাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে তাতে সরকারি ছাপ এবং একটি নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন নম্বর রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওয়াক্ফ বোর্ডের মতে, নিকাহকে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে না রেখে সরকারি নথির সঙ্গে যুক্ত করলে স্বচ্ছতা বাড়বে। ফলে ভবিষ্যতে বিবাহসংক্রান্ত কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে এই সরকারি নথিটি আদালতে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
মুসলিম সংগঠনের অসন্তোষ ও বিতর্ক
তবে ওয়াক্ফ বোর্ডের এই পদক্ষেপকে সহজভাবে মেনে নেয়নি মুসলিম সংগঠনগুলির একাংশ। ‘মুসলিম সেবা সংগঠন’-এর চেয়ারম্যান নঈম কুরেশি এই প্রস্তাবকে “অসাংবিধানিক ও বেআইনি” বলে তোপ দেগেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইউসিসি প্রণয়নের সময় আলাদা নিকাহনামা বা আলেমদের নিবন্ধনের বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলা ছিল না।
অন্যদিকে, ‘জামায়াতে ইসলামি হিন্দ’-এর সহ-সভাপতি অধ্যাপক সলিম ইঞ্জিনিয়ারের মতে, মুসলিম সমাজের সাথে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, নিকাহ সম্পন্ন হতে বর-কনের সম্মতি ও সাক্ষীই যথেষ্ট; সেখানে সরকারি নিবন্ধিত কাজির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। ফলে এই পরিবর্তন ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কি না—তা নিয়ে বিতর্ক জোরালো হচ্ছে।
তবে ওয়াক্ফ বোর্ড জানিয়েছে, এটি এখনো প্রস্তাবিত খসড়া মাত্র। ৯ সেপ্টেম্বর বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার পরই নতুন নিকাহনামার চূড়ান্ত রূপ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
