গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে আঘাত : দিল্লিতে সাংবাদিক নাফিসা ও শাহিনের ওপর পুলিশের নির্যাতন !

Allegations of harassment of two Muslim female journalists at a police station in Delhi.

বিশেষ প্রতিবেদন

রাজধানী দিল্লির সকেত থানায় দুই মুসলিম মহিলা সাংবাদিক—নাফিসা খান এবং শাহিন খানকে আটক করে নির্মমভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রশ্ন করার “অপরাধে” এবং সংখ্যালঘু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁদের ওপর পুলিশি বর্বরতা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।

ঘটনাপ্রকাশ পাওয়ার পর অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-র সহকর্মী, কমরেড নেহা এবং একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সংহতি জানাতে সকেত থানায় পৌঁছে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ প্রশাসন কেবল প্রাথমিক অভিযোগপত্র বা এফআইআর (FIR) গ্রহণ করতেই অস্বীকার করেনি, বরং ঘটনার রাতে থানায় এক থমথমে ও অসাংবিধানিক পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়।

সকেত থানার ঘটনা এবং অভিযোগের মূল বিবরণ NewsGram

  • প্রশ্ন করার মাশুল ও নির্যাতন: ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম 4PM News Network-এর সঙ্গে যুক্ত দুই সাংবাদিক নাফিসা ও শাহিন এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করতেই তাঁদের জোরপূর্বক ধরে সকেত থানায় নিয়ে আসা হয়।
  • বন্ধ ঘরে অত্যাচার ও সাম্প্রদায়িক হেনস্থা: থানায় নিয়ে আসার পর তাঁদের একটি ঘরে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত একাধিক ভিডিওতে সাংবাদিকদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নাম ও পরিচয় জানতে পেরে তাঁদের লক্ষ্য করে সাম্প্রদায়িক স্লোগান ও বিদ্বেষমূলক গালিগালাজ চালানো হয় এবং নির্যাতনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
  • থানার অসংবেদনশীল ভূমিকা: দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কোনো এফআইআর দায়ের করেনি। এসিপি (ACP) বা থানার এসএইচও (SHO) কেউই বিক্ষোভরত সাংবাদিক ও ছাত্রনেতাদের মুখোমুখি হননি বা আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেননি। ফলে থানার ভেতরেই রাতভর ধর্না ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চালাতে বাধ্য হন বিক্ষোভকারীরা। (যদিও দিল্লি পুলিশ সরকারিভাবে জানিয়েছে, ভিভিআইপি রুট বা নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁদের আটক করা হয়েছিল এবং মারধরের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

সকেত থানার এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ভারতে গত কয়েক বছরে সংকুচিত হতে থাকা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতারই এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি।

  • গ্লোবাল প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স (World Press Freedom Index): ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ (RSF)-এর গ্লোবাল ইনডেক্স বা বিশ্ব সংবাদ মাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে নেমে গেছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১৫০-র নিচে (সর্বশেষ সূচকে ১৫৯তম স্থান) নেমে এসেছে।
  • ভয়ের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন: স্বাধীন সাংবাদিকতা, বিশেষ করে ডিজিটাল ও স্বাধীন ধারার সাংবাদিকদের (Independent Journalists) ওপর হামলা, আটক, রাষ্ট্রীয় এজেন্সির অপব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগিয়ে হেনস্থা করার প্রবণতা সূচকে ভারতের এই অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ।

প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব

আইন রূপায়নকারী সংস্থা নিজেই যখন আক্রান্ত ব্যক্তির অভিযোগ বা এফআইআর নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তা আইনের শাসনের (Rule of Law) ভিত্তিমূলকে নাড়িয়ে দেয়। পুলিশ প্রশাসনের এই নীরবতা রাষ্ট্রযন্ত্রের একপেশে মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

লিঙ্গ ও ধর্মভিত্তিক আক্রমণ

এই ঘটনার মাধ্যমে পরিষ্কার যে, কোনো সাংবাদিক যদি একই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এবং নারী হন, তবে তাঁর ওপর আক্রমণের ধরন দ্বিগুণ হিংস্র রূপ ধারণ করে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার এই সংকট স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার একটি মারাত্মক ছক।

বাক-স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা

ক্ষমতার করিডোরে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকতার মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের (বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা) ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত

সকেত থানায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা কেবল দুই সাংবাদিকের ওপর আঘাত নয়, এটি দেশের সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হামলা। প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া (PCI), ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কর্পস (IWPC) এবং একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ইতিধ্যেই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তদন্ত ও দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। মুক্ত সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত জরুরি।