মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা: নেপালে ১১ দিন পর সুড়ঙ্গ ও ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার ২, মিরাকেলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে ত্রিশূলী

Two rescued alive from tunnel and rubble in Nepal after 11 days.

বিশেষ প্রতিবেদন

নেপাল: কাদার স্তূপ, ভেঙে পড়া পাথর আর চারপাশের গা ছমছমে নীরবতা—যার গভীরে শুধুই মৃত্যুর প্রহর গোনা। যে দুর্যোগ এক নিমিষে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে শত শত ঘরবাড়ি, চুরমার করে দিয়েছে স্বপ্ন, সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ২৬৪ ঘণ্টা আটকে থাকা কি আদৌ সম্ভব? নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ধসের ১১ দিন পর অলৌকিক রূপকথাকেই বাস্তবে সত্যি প্রমাণ করলেন দুই জীবনসংগ্রামী।

ভয়াবহ বন্যার ১১ দিন পর যখন আশা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই নেপালের দুই পৃথক এলাকা থেকে জীবিত উদ্ধার করা হলো ৬৪ বছরের এক নেপালি বৃদ্ধা এবং এক চিনা নাগরিককে। মৃত্যুর অন্ধকারকে জয় করে এই দুজন আলোয় ফেরায় উদ্ধারকারীদের চোখে যেমন স্বস্তির জল, তেমনই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা শত শত মানুষের পরিবারের মনে নতুন করে জেগে উঠেছে অলৌকিক বেঁচে থাকার আশা।

অন্ধকারের একাকীত্ব ভেঙে আলোর দিশা

নুওয়াকোট জেলার বেত্রাবতী বাজার। চারপাশ প্লাবিত করে বয়ে যাওয়া ত্রিশূলী নদীর তণ্ডবলীলার পর যেখানে শুধুই কাদা আর ধ্বংসের চিহ্ন। সেখানেই আনন্দ শ্রেষ্ঠের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে নুওয়াকোটের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ইনস্পেক্টর সুমন বিকের দল উদ্ধার করে ৬৪ বছর বয়সী চন্দ্রিকা শ্রেষ্ঠকে। যখন তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তিনি প্রায় অচেতন। চারপাশের তাণ্ডব আর চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কীভাবে এই ৬৪ বছরের প্রবীণা টানা ১১ দিন খাবার ও জল ছাড়া টিকে রইলেন, তা ভেবে শিউরে উঠছেন উদ্ধারকারীরাও।খবর পেয়েই প্রধানমন্ত্রীর দফতরের উদ্যোগে সেনা হেলিকপ্টারে করে চন্দ্রিকাদেবীকে নিয়ে যাওয়া হয় ত্রিশূলীর নেপালি সেনাবাহিনীর মৈথিলী ব্যারাকে। সেখানে তাঁকে দেওয়া হয় জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা। জীবন ও মৃত্যুর একদম শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধার এখন একমাত্র ঠিকানা হাসপাতালের আইসিইউ, তবে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন—তিনি লড়ছেন।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষণ্ণ সুড়ঙ্গে জীবনের আলো

অন্যদিকে, রসুয়া জেলার ২১৬ মেগাওয়াটের ‘আপার ত্রিশূলী-১’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকাটি যেন এখন কোনো অভিশপ্ত উপত্যকা। পাহাড়ি ধস আর বানভাসি জলের তোড়ে প্রকল্পের বিশাল পরিকাঠামো ছারখার হয়ে গেছে। চারপাশের টানেল বা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো ঢেকে গেছে বিপুল কাদামাটিতে। সেই কালো আঁধারে ঢাকা সুড়ঙ্গের ভেতরেই ১১ দিন ধরে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলেন এক চিনা প্রকৌশলী।

উদ্ধারকারী দল যখন সুড়ঙ্গের মুখ কেটে ভেতরে পৌঁছায়, তখন কাদায় মাখামাখি ওই চিনা নাগরিকের চোখে ফুটে ওঠে প্রাণ পাওয়ার অদ্ভুত এক কাতরতা। এর ঠিক এক দিন আগেই এই নুওয়াকোটেরই ‘আপার ত্রিশূলী-৩এ’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে আরও দুই নেপালি তরুণকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। সুড়ঙ্গের সংকীর্ণ ও বায়ুহীন খাঁচায় আটকে থেকেও পরপর এই উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করছে—প্রকৃতির তাণ্ডবের চেয়ে মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী।

সুড়ঙ্গের খাঁচায় আটকে ৯৩৬ প্রাণ: মরণপণ লড়াই আন্তর্জাতিক টিমের

এই অলৌকিক বেঁচে ফেরার গল্পগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও এক তীব্র হাহাকার। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন, নেপাল (IPPAN)-এর তথ্য অনুযায়ী, রসুয়া ও নুওয়াকোটের ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত অন্তত ৯৩৬ জন কর্মীর এখনও কোনো খোঁজ নেই! এর মধ্যে শুধুমাত্র ‘আপার ত্রিশূলী-১’ প্রকল্পেই নিখোঁজ ৫৫১ জন। তাঁরা কি সুড়ঙ্গের কোনো পকেটে জল-বাতাস পেয়ে আটকে আছেন, নাকি চাপা পড়েছেন পাহাড়ের নিচে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে রাতদিন এক করে দিচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।নেপালি সেনার পাশাপাশি ভারতের বিশেষজ্ঞ দল, চিন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিবিদরা এখন অত্যাধুনিক সেন্সর ও ড্রিলিং মেশিন নিয়ে নামে পড়েছেন উদ্ধারকাজে। ধসে যাওয়া সড়ক ও ধ্বংসস্তূপের বাধা ঠেলে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলোতে পৌঁছানোই এখন বিশ্বজুড়ে আসা এই বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আঁধার পেরিয়ে আলোর প্রত্যাশা

১১ দিন কম সময় নয়। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, এক ফোঁটা আলোর মুখ না দেখে কীভাবে এক একজন মানুষ মাটির শয়ে শয়ে ফুট নিচে আটকে থাকতে পারেন, তা আধুনিক বিজ্ঞানকে থমকে দিচ্ছে। কিন্তু চন্দ্রিকা শ্রেষ্ঠ কিংবা সেই চিনা নাগরিকের বেঁচে ফেরা প্রমাণ করে দিল—যতক্ষণ শ্বাস আছে, ততক্ষণ আশাও আছে।ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা যে মায়েরা এখনো পথ চেয়ে বসে আছেন নিখোঁজ ছেলের জন্য, কিংবা যে স্ত্রীরা স্বামীর ফেরার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন—এই দুই অলৌকিক উদ্ধার তাঁদের বুকে নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়ে দিল। নেপালের এই বিষাদময় উপত্যকা এখন শুধু একটাই প্রার্থনায় দিন গুনছে—ঘন কালো সুড়ঙ্গ ভেদ করে আরও অনেক জীবন ফিরে আসুক আলোর পৃথিবীতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *