The alarming picture of child marriage and teenage motherhood in West Bengal.
বিশেষ প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিয়ে এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সন্তান প্রসবের (Teenage Pregnancy/Delivery) সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সোমবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের সামনে রাজ্যের এই উদ্বেগজনক বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি প্রকাশ করেন যে, ১৮ বছরের নিচে বিয়ে এবং ১৮ বছরের নিচে সন্তান প্রসবের ঘটনায় রাজ্যটি বর্তমানে সর্বভারতীয় স্তরে শীর্ষস্থানে (এক নম্বরে) অবস্থান করছে।
গত ৬ মাসে (১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত) রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে নথিভুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের (Institutional Delivery) তথ্য পরীক্ষা করে এই সামাজিক ব্যাধির ভয়াবহ রূপ সামনে এসেছে।
২. গত ৬ মাসের পরিসংখ্যান (১ জানুয়ারি ২০২৬ – ৩০ জুন ২০২৬)
স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে সংগৃহীত তথ্যে মূল দুটি জেলার যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে:
ক) মুর্শিদাবাদ জেলা (সর্বোচ্চ আক্রান্ত জেলা)
- মোট অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভধারণ/প্রসব: ১২,৮৪৭ টি
- গ্রামীণ এলাকা: ১২,৫৮৫ টি
- শহরাঞ্চল: ২৬২ টি
- বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস:
- ১০ থেকে ১৩ বছর: ২০ জন
- ১৩ থেকে ১৫ বছর: ৮১৭ জন
- ১৫ থেকে ১৮ বছর: ৬,৫২৭ জন
- ১৮ বছর (গর্ভধারণকালে অপ্রাপ্তবয়স্ক): ৫,৪৮৩ জন
খ) দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা (দ্বিতীয় স্থান)
- মোট অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভধারণ/প্রসব: ৪,১৭৮ টি
- গ্রামীণ এলাকা: ৪,০৬৩ টি
- শহরাঞ্চল: ১১৫ টি
- বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস:
- ১০ থেকে ১৩ বছর: ৫ জন
- ১৩ থেকে ১৫ বছর: ২৪৪ জন
- ১৫ থেকে ১৮ বছর: ১,৯৫৯ জন
- ১৮ বছর: ১,৯৬০ জন
৩. বাল্যবিবাহ ও পকসো (POCSO) আইনের অধীনে শাস্তিমূলক বিধান
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ আইন ২০০৬ এবং পকসো (POCSO) আইনের মাধ্যমে এই অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে:
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন, ২০০৬ (PCMA) অনুযায়ী:
- সংজ্ঞা: মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছরের কম বয়স হলে আইনত ‘শিশু’ হিসেবে গণ্য হবে।
- ধারা ৯ (প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের শাস্তি): ১৮ বছরের উর্ধ্বে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
- ধারা ১০ (সহায়তাকারী ও সম্পাদকের শাস্তি): পুরোহিত, কাজী, বাবা-মা, অভিভাবক বা বিবাহের আয়োজনকারী যে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে।
- ধারা ১১ (অভিভাবকের অবহেলা): অভিভাবক বাল্যবিয়েতে অনুপ্রেরণা দিলে বা প্রতিরোধে অবহেলা করলে আইনি ব্যবস্থার বিধান রয়েছে।
- আইনি বৈশিষ্ট্য (ধারা ১৩): এই আইন লঙ্ঘন আমলযোগ্য (Cognizable) এবং জামিনঅযোগ্য (Non-Bailable)।
পকসো (POCSO) আইন ও গর্ভধারণ সম্পর্কিত শাস্তি:
- যৌন অপরাধ (ধারা ৩/৪): ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গঠিত যৌন সম্পর্ককেও পকসো আইনের ৩/৪ ধারা অনুযায়ী যৌন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর শাস্তি ন্যূনতম ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, যা আমৃত্যু কারাদণ্ডে সম্প্রসারিত হতে পারে।
- গুরুতর অপরাধ ও গর্ভধারণ (ধারা ৬): অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণের ক্ষেত্রে পকসো-র ৬ নম্বর ধারা প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে ন্যূনতম ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, যা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
- বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং (ধারা ১৯): কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে গর্ভবতী হলে তা পকসো-র ১৯ ধারা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা প্রশাসনের তরফে পুলিশকে জানানো আইনত আবশ্যক।
৪. প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেছে:
- শোকজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ: যে সমস্ত অপ্রাপ্তবয়স্কের হাসপাতাল ডেলিভারি হয়েছে, তাদের স্বামীদের চিহ্নিত করে স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে শোকজ নোটিশ পাঠানো হচ্ছে।
- বয়সের প্রমাণ জমা: সংশ্লিষ্ট মেয়ের বয়স যে বিবাহের সময় এবং গর্ভধারণকালে ১৮ পার হয়েছিল, তার প্রমাণ স্বামী বা পরিবারকে ১ মাসের মধ্যে পেশ করতে হবে।
- অভিযান ও গ্রেপ্তার: প্রমাণ না মিললে ডিজি (DGP) ও রাজ্য পুলিশের সহায়তায় দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
