The Politics of Expelling Infiltrators and the Citizenship Crisis
বিশেষ প্রতিবেদন:
কাজের প্রয়োজনে ছত্তিশগড় গিয়ে সেখানে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে আটকে পড়েছেন মুর্শিদাবাদের ২৩ জন পরিযায়ী শ্রমিক। তাঁদের ঠাঁই হয়েছে রায়পুরের ডিটেনশন সেন্টারে। ভারতীয় নাগরিকত্বের যাবতীয় প্রমাণপত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁদের ওপর নেমে এসেছে এই হয়রানি। কিন্তু এই ট্র্যাজেডি কেবল ভিনরাজ্যের সীমানাতেই সীমাবদ্ধ নেই—নিজের রাজ্যের মাটিতে দাঁড়িয়েও বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের একই ধরনের শঙ্কা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ছত্তিশগড়ের বিলাসপুর থেকে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ—ঘটনার স্থান বদলালেও অভিযোগের পটভূমি এক: বাংলা ভাষায় কথা বলা এবং নির্দিষ্ট প্রান্তিক পরিচয় থাকলে সহজেই গায়ে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে ‘বাংলাদেশি’ তকমা।
১. পরবাসে নিঃসঙ্গ লড়াই: ছত্তিশগড়ের বিলাসপুর থেকে রায়পুরের ডিটেনশন সেন্টার
গত ৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরের চুনচিয়াপাড়া-গণেশ নগর এলাকা থেকে সির্গিতী থানার পুলিশ আচমকাই তুলে নিয়ে যায় মুর্শিদাবাদের সুতি ও সামশেরগঞ্জ এলাকার ২৩ জন ফেরিওয়ালাকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাহাবাদ গ্রামের এজাজুল শেখ, শফিকুল আলম, ইসলাম শেখ, কিরণ শেখ এবং ধুলিয়ানের মোস্তাকিম শেখের মতো প্রবীণ ও তরুণ শ্রমিকরা।
- ঘটনার পেছনের কারণ: স্থানীয় প্রশাসনের দাবি ছিল নথি যাচাই। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ—ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, এমনকি ভিটেমাটির দলিল দেখানোর পরেও বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই তাঁদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে সোজা রায়পুরের হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়।
- পরিবারের কান্না ও ক্ষোভ: আটক শ্রমিক শফিকুল আলমের স্ত্রীর প্রশ্ন, “পেটের তাগিদে কাজ করতে গেছে। আমরা এই দেশের নাগরিক, আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটে এই মাটিতে। খালি বাংলায় কথা বলি বলেই কি আমাদের বাংলাদেশি বলে জেলে পুরে দেবে?”
- প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা: জঙ্গিপুর জেলার পুলিশ সুপার পি. ডি. সুরিন্দর সিং ছত্তিশগড় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অন্যদিকে জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান এবং রাজ্যসভার সাংসদ সমীরুল ইসলাম এই ঘটনাকে বাঙালি ও সংখ্যালঘুদের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বলে তোপ দেগেছেন।
২. নিজের ঘরেই পরবাসী: উত্তর দিনাজপুরের জলিল শেখের ঘটনা
ভিনরাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের নিপীড়ন যখন সামাজিক স্তরে আতঙ্ক তৈরি করছে, ঠিক তখনই নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বুকেও ঘটে গেছে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা জলিল শেখকে রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে দাগিয়ে থানায় আটকে রাখা হয়।
- আদালতের হস্তক্ষেপ ও পরিচয় সত্যতা: কোনো আগাম নোটিশ বা যথাযথ তদন্ত ছাড়াই জলিল শেখকে অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতে পৌঁছালে এবং আইনি লড়াইয়ের পর স্পষ্ট হয় যে, জলিল শেখ ও তাঁর পরিবার বংশপরম্পরায় উত্তর দিনাজপুরেরই স্থায়ী অধিবাসী। আদালত তাঁকে জামিন দিলেও, যে সামাজিক হেনস্থা ও মানসিক অত্যাচারের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে, তা এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
৩. সংকটে বাংলা ভাষা ও সাংবিধানিক অধিকার
ভারতবর্ষের সংবিধানের ১৯(১)(d) এবং ১৯(১)(e) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের যেকোনো নাগরিক স্বাধীনভাবে যেকোনো রাজ্যে যাতায়াত করতে এবং বসবাস করতে পারেন। তদুপরি, কেন্দ্র সরকার কর্তৃক বাংলা ভাষা ‘ধ্রুপদী ভাষা’ (Classical Language)-র স্বীকৃতি পেয়েছে।
তা সত্ত্বেও হরিয়ানা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র বা ছত্তিশগড়ের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির পাশাপাশি নিজ রাজ্যেও সাধারণ মানুষকে তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বা রেশন কার্ডের মতো নথি থাকা সত্ত্বেও শুধু ভাষাগত পরিচয়ের কারণে প্রশাসনিক অতিসক্রিয়তা তৈরি করছে এক বিপজ্জনক সামাজিক বিভাজন।
আশঙ্কা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে আইনি প্রক্রিয়া মেনে কাজ করা যেকোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু সেই আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে যদি প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দীর্ঘসময় ডিটেনশন বা পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়, তবে তা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ও নাগরিক অধিকারের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে।
সামনে যখনই কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়, তখনই কি বাংলাভাষী ও প্রান্তিক মানুষদের বলির পাঁঠা হতে হবে? উত্তর দিনাজপুরের জলিল শেখ থেকে শুরু করে রায়পুরের ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি মুর্শিদাবাদের ২৩ জন শ্রমিক—সবার একই প্রশ্ন: নিজের দেশেই নিজের পরিচয় প্রমাণের এই পরীক্ষা আর কতদিন দিতে হবে?
