মিশিগানে ইতিহাস গড়ে মার্কিন সেনেটে প্রথম মুসলিম সাংসদ ড. আব্দুল আল-সায়েদ

Dr. Abdul El-Sayed, the first Muslim lawmaker in the US Senate

নিজস্ব প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানচিত্রে রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। ২০২৬ সালের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগানের মার্কিন সেনেট আসনে জয়লাভ করে আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সেনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন প্রগতিশীল ডেমোক্রেটিক নেতা ড. আব্দুল আল-সায়েদ (Abdul El-Sayed)। তাঁর এই ঐতিহাসিক জয় কেবল মিশিগানের গুরুত্বপূর্ণ আসনটি ডেমোক্রেটদের ঝুলিতেই ধরে রাখেনি, বরং মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে দলের পালে শক্তিশালী হাওয়া লাগিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা থেকে সেনেট পর্যন্ত এক অদম্য যাত্রা

৪২ বছর বয়সী আব্দুল আল-সায়েদ পেশায় একজন চিকিৎসক । মিশিগানে বেড়ে ওঠা এই প্রগতিশীল নেতা এর আগে ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। সাধারণ কর্মজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, রাজনীতিতে কর্পোরেট প্রভাব কমানোর পাশাপাশি তাঁর নির্বাচনী ইশতেফারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ (Medicare for All)-এর মতো সর্বজনীন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি।অবসরপ্রাপ্ত ডেমোক্রেটিক সেনেটর গ্যারি পিটার্সের স্থলাভিষিক্ত হতে গিয়ে আব্দুল তাঁর বামপন্থী ও জনমুখী নীতির মাধ্যমে তরুণ ও খেটে খাওয়া ভোটারদের মনে গভীর রেখাপাত করেন।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং প্রচারের উত্তাপ

মিশিগানের এই আসনে ডেমোক্রেটদের দুর্গ ভাঙতে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল। আব্দুল আল-সায়েদের প্রতিপক্ষ হিসেবে লড়েছিলেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, সাবেক কংগ্রেসম্যান এবং এফবিআই এজেন্ট মাইক রজার্স (৬৩)। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জাতীয় রিপাবলিকান নেতৃত্বের শক্তিশালী সমর্থনে রজার্স নির্বাচনী ময়দানে নেমেছিলেন। প্রচারাভিযানে আব্দুলকে উগ্রপন্থী হিসেবে তুলে করার চেষ্টা চালালেও সেই অপপ্রচার ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়।

“মিশিগান, আমরা এটা করে দেখিয়েছি!”

নির্বাচনী ফলাফলের পর মিশিগানের ডেট্রয়েটে নিজের নির্বাচনী হেডকোয়ার্টারে আবেগঘন এক ভাষণে ড. আব্দুল আল-সায়েদ বলেন, “মিশিগান, আমরা এটা করে দেখিয়েছি! আপনাদের সেনেটর-ইলেক্ট হিসেবে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আপনাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও সম্মানিত।”আমেরিকার মুসলিম ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য এই জয় এক সুদূরপ্রসারী অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। একদিকে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন, অন্যদিকে দেশের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে প্রগতিশীল রাজনীতির এই পুনরুত্থান আগামী দিনে মার্কিন রাজনীতিকে যে এক নতুন পথে পরিচালিত করবে, তা বলাই বাহুল্য।

বর্ণবাদ ও পরিচয় সংকটের বিরুদ্ধে জয়

মাইক রজার্সের মতো হেভিওয়েট ও রক্ষণশীল প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ড. আব্দুল আল-সায়েদ প্রমাণ করেছেন যে, পরিচয়ের রাজনীতি বা ধর্মীয় ভীতি প্রদর্শনের উর্ধ্বে উঠে জনকল্যাণমূলক নীতি ও মেধার মূল্যায়ন করানো যায়। বিশ্বজুড়ে যেখানে ইসলামোফোবিয়া ও উগ্র জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, সেখানে একজন প্রকাশ্য মুসলিম নেতার এই বিজয় আত্মপরিচয়ের গর্বিত স্বীকৃতি।

৩. প্রগতিশীল রাজনীতি ও অধিকার আদায়ের নতুন মডেল

আব্দুল আল-সায়েদ কেবল একজন মুসলিম পরিচয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা (‘মেডিকেয়ার ফর অল’) এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার পক্ষে কথা বলেছেন। নিপীড়িত মানুষের কাছে এটি একটি বড় পাঠ—ধর্ম বা পরিচয়ের গণ্ডির বাইরে গিয়ে সার্বজনীন মানবিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের পক্ষে দাঁড়ালেই গণসমর্থন অর্জন করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *