যে বাড়িতে জন্ম নিয়েছিল সানাইয়ের জাদু, সেই বাড়িতেই বুলডোজারের আঘাত! বিতর্কে ভারতরত্ন বিসমিল্লাহ খান

Controversy over the demolition of Bismillah Khan’s house

বিশেষ প্রতিবেদন

বেনারস :গঙ্গার ঢেউয়ে আজও হয়তো কান পাতলে ভেসে আসে সানাইয়ের সুতীব্র আকুতি। বেনারসের অলিগলিতে আজও প্রতিধ্বনিত হয় সেই সুরের মায়াজাল। কিন্তু যে ঘরটিতে বসে একদিন নিজের নিঃশ্বাসে সুর তুলেছিলেন এক কিংবদন্তি, সেই সাধনাভূমি আজ নিজেই অস্তিত্বের সংকটে ভাঙার মুখে! ভারতরত্ন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের বেনারসের পৈতৃক বাড়ি ভাঙাকে কেন্দ্র করে দানা বাঁধা বিতর্ক আজ কেবল একটি ইঁট-পাথরের প্রশ্ন নয়—এটি আমাদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব আর স্মৃতিকাতরতার এক বেদনাবিধূর দলিল।

বেনারস মানেই তো বিসমিল্লাহ, আর বিসমিল্লাহ মানেই তো বেনারস!

কাশীর গঙ্গার ঘাট, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর মসজিদের আজান—এই তিনের এক অপূর্ব ঐকতান ছিল বিসমিল্লাহ খানের জীবন। ১৯১৬ সালের ২১ মার্চ বিহারের ডুমরাওয়ে জন্ম হলেও তাঁর শেহনাইয়ের নাড়ির যোগ তো এই কাশীর সঙ্গেই বাঁধা। মামা উস্তাদ আলি বক্সের হাত ধরে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের আঙিনায় যার শুরু, সেই সুরের সাধক পরে গোটা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন নিজের জাদুতে।

বিদেশের মাটিতে স্থায়ী হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ, তাঁর রক্তে মিশে ছিল বেনারসের ধুলো, গঙ্গার বয়ে চলা জলধারা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গঙ্গার দিকে তাকিয়ে শেহনাইয়ের রেওয়াজ করতেন তিনি। তাঁর কাছে বেনারস মানে কোনো সাধারণ ভূখণ্ড ছিল না; বেনারস ছিল তাঁর ইবাদত, তাঁর মোক্ষ, তাঁর সানাইয়ের প্রাণভোমরা।

লালকেল্লা থেকে সারাই হরহা—যে ঘরের চারলেয়া জানে ইতিহাস

১৯৩৬ সালে কেনা সারাই হরহা এলাকার সেই বাড়িটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় মন্দির। সেই বাড়ির ছোট্ট একটি ঘরে বসেই তিনি সাধনা করতেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোরে লালকেল্লার লাল পাথরের প্রাচীর ছাপিয়ে যখন তাঁর শেহনাইয়ের সুর গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন গোটা দেশ কেঁদেছিল আনন্দাশ্রুতে। পদ্মশ্রী থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ভারতরত্ন’—সব মুকুটই তাঁর মুণ্ডিত ললাটে শোভা পেয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট তাঁর প্রয়াণের পর থেকেই যেন অবহেলা আর বিতর্কের কালো ছায়া নেমে এসেছে তাঁর সেই স্মৃতিবিজড়িত ঘরটির ওপর।

ভাঙাগড়ার রাজনীতি নাকি উত্তরাধিকারের অবহেলা?

২০২০ সালেও তাঁর রেওয়াজের ঘর ভাঙা নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। আর এবার ২০২৬ সালে সেই বাড়ির একাংশ ভাঙার ছবি সামনে আসতেই ফের শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা।অখিলেশ যাদব এই ঘটনার জন্য কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন রাজ্য় সরকারকে। তাঁর প্রশ্ন—যাঁদের জন্য কোনোদিন সানাই বাজেনি, তাঁরা কি বুঝবেন এই সুরের মর্ম? অন্যদিকে, বারাণসী পুরনিগম ও পুলিশের সাফাই, বাড়িটি জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের লোকেরাই নিজেদের উদ্যোগে এটি পুনর্নির্মাণ করছেন। পরিবারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একতলায় সংগ্রহশালা আর দোতলায় থাকবে থাকার ব্যবস্থা।সব যুক্তির ভিড়েও আজ একটা ভীষণ ভারী প্রশ্ন এসে ধাক্কা মারে আমাদের বিবেককে।

দায় কার? পরিবারের নাকি সমগ্র জাতির?

বিসমিল্লাহ খান কি শুধুই কোনো একটি পরিবারের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন এক এবং অদ্বিতীয় ভারতীয় সংস্কৃতির জীবন্ত আলোকবর্তিকা?

যে মানুষটি নিজের শিল্পে কোনো দিন হিন্দু বা মুসলমানের ভেদাভেদ দেখেননি—যিনি পরম শ্রদ্ধায় একহাতে আল্লার নাম আর অন্যহাতে মা সরস্বতী ও বাবা বিশ্বনাথকে স্মরণ করে সানাইয়ে ফুঁ দিতেন, আজ তাঁর স্মৃতির সুরটুকু ধরে রাখার দায়িত্ব কি কেবল তাঁর রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দেরই? রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজ—আমরা কি আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি চিরকাল এমনই উদাসীন থেকে যাব?

বাড়ি হয়তো আবার নতুন করে ইঁট-সিমেন্টে গড়ে উঠবে। কিন্তু যে খাঁজকাটা ঘরে বসে একটি মানুষ গঙ্গার দিকে তাকিয়ে পৃথিবীকে সুরের মন্ত্রে জাদুকরি করে তুলেছিলেন, সেই ঘরের আদি গন্ধটুকু কি আর ফিরিয়ে আনা যাবে?

আজ গঙ্গার বুক দিয়ে বয়ে চলেছে অন্তহীন জলধারা। বেনারসের কোনো এক গোধূলি লগ্নে হয়তো আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায় কোনো অচেনা শেহনাইয়ের সুর। কিন্তু সেই সুরের উৎস-ঘরটুকু যদি ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়, তবে আগামী প্রজন্মকে আমরা কী চেনাব? বলবো কেমন করে—এই সেই মাটি, যেখান থেকে একদিন ছড়িয়ে পড়েছিল এক ভারতরত্নের অমর সৃষ্টি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *