পাসপোর্টও আর নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়? বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক, বাড়ছে উদ্বেগ

Passport Controversy

বিশেষ রির্পোট-

ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে ঠিক কোন নথিকে শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ সম্প্রতি বিদেশ মন্ত্রক (MEA) স্পষ্ট জানিয়েছে, ভারতীয় পাসপোর্ট একটি ভ্রমণ নথি (Travel Document), এটি নাগরিকত্বের প্রমাণ (Proof of Citizenship) নয়।

এই বক্তব্য সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে এমন সময়ে এই মন্তব্য এসেছে, যখন শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই প্রায় ২৭ লক্ষ আবেদনকারী ভোটার তালিকায় নাম ফিরে পাওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে তাঁদের অন্যতম বড় দায়িত্ব হবে, তাঁরা যে ভারতের নাগরিক, তা প্রমাণ করা।

SIR-এ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য কোন কোন নথি গুরুত্ব পাচ্ছে?

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (SIR)-এর সময় আবেদনকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের নথি চাওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • জন্ম শংসাপত্র (Birth Certificate)
  • পিতা বা মাতার জন্ম শংসাপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
  • স্কুলের ভর্তি বা ছাড়পত্র (School Leaving/Admission Certificate)
  • মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষাগত শংসাপত্র
  • জমির দলিল বা রেকর্ড অব রাইটস (ROR)
  • সরকারি চাকরির নথি (যদি থাকে)
  • পেনশন সংক্রান্ত নথি
  • স্থায়ী বাসিন্দার প্রমাণপত্র
  • রেশন কার্ড (পরিচয় ও ঠিকানার সহায়ক নথি হিসেবে)
  • পাসপোর্ট (যদি থাকে)
  • অন্যান্য সরকারি নথি, যেখানে জন্মতারিখ, জন্মস্থান বা পারিবারিক সম্পর্কের তথ্য রয়েছে।

কোন নথির কী গুরুত্ব?

  • আধার কার্ড: পরিচয় প্রমাণের জন্য ব্যবহারযোগ্য, নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।
  • পাসপোর্ট: বিদেশে ভ্রমণের সরকারি নথি, বিদেশ মন্ত্রকের মতে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
  • ভোটার পরিচয়পত্র (EPIC): ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের প্রমাণ, নাগরিকত্বের একমাত্র প্রমাণ নয়।
  • জন্ম শংসাপত্র ও পারিবারিক নথি: বর্তমানে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলির মধ্যে অন্যতম।

অনেকের ধারণা ছিল, যদি কারও ভারতীয় পাসপোর্ট থাকে, তবে সেটাই নাগরিকত্বের অন্যতম শক্তিশালী প্রমাণ। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রকের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই ধারণায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

বিদেশ মন্ত্রক কী বলেছে?

বিদেশ মন্ত্রকের এক সাংবাদিক বৈঠকে জানানো হয়, পাসপোর্টের মূল উদ্দেশ্য বিদেশে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া। এটি নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে তৈরি করা হয় না।

তাঁদের যুক্তি, পাসপোর্ট ইস্যুর আগে আবেদনকারীর পরিচয় ও নথি যাচাই করা হলেও, পাসপোর্ট নিজে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত আইনি প্রমাণ নয়। বিদেশে ভ্রমণের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, নাগরিকত্ব নির্ধারণের নথি হিসেবে এর আলাদা আইনি মর্যাদা নেই।

সুপ্রিম কোর্টও কী বলেছে?

নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (SIR) সংক্রান্ত বিহার মামলার শুনানিতে ১২ জুন ২০২৫-এ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মালা বাগচীর বেঞ্চও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে।

আদালত জানায়, আধার কার্ড পরিচয় প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে নয়।

অর্থাৎ, আধার কার্ড থাকলেই নাগরিকত্ব প্রমাণ হয় না—এমনটাই আদালতের পর্যবেক্ষণ।

আগেও আদালত কী বলেছিল?

এই বিষয়ে আদালতের আগের রায়ও একই ধরনের ইঙ্গিত দেয়।

২০১৩ সালে বোম্বে হাইকোর্ট এক রায়ে বলেছিল, শুধুমাত্র ভারতীয় পাসপোর্ট থাকলেই কোনও ব্যক্তির ভারতীয় নাগরিকত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না।

অর্থাৎ, আদালতের দৃষ্টিতেও পাসপোর্ট একমাত্র বা চূড়ান্ত নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।

তাহলে নাগরিকত্ব প্রমাণ হবে কী দিয়ে?

এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।

২০১৯ সালে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) সংক্রান্ত এক প্রশ্নোত্তরে প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB) জানিয়েছিল, জন্মতারিখ ও জন্মস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন নথির মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা যেতে পারে। তবে কোন কোন নথি চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেই।

তাহলে আপত্তি কোথায়?

আইনগতভাবে বিদেশ মন্ত্রক বা আদালতের বক্তব্য নতুন নয়। কিন্তু আপত্তি অন্য জায়গায়।

একদিকে আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় বলা হচ্ছে। অন্যদিকে পাসপোর্টও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় বলে জানানো হয়েছে। অথচ ভোটার তালিকা, ট্রাইব্যুনাল বা ভবিষ্যতের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মামলায় মানুষকে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতেই হবে।

ফলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—তাহলে শেষ পর্যন্ত কোন নথি দেখালে একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি মিলবে?

বাড়ছে ধোঁয়াশা

বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব প্রমাণের বিষয়ে যতদিন পর্যন্ত স্পষ্ট ও একরকম সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ না হচ্ছে, ততদিন এই ধোঁয়াশা থেকেই যাবে।

বিশেষ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় ফেরানোর লড়াই লড়ছেন, তখন নাগরিকত্ব প্রমাণের গ্রহণযোগ্য নথি নিয়ে অস্পষ্টতা মানুষের মধ্যে আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও হতাশা আরও বাড়াতে পারে।

প্রশ্ন একটাই—যদি আধার নয়, পাসপোর্টও নয়, তাহলে ভারতের একজন সাধারণ নাগরিক তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণ করবেন ঠিক কোন নথির ভিত্তিতে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেওয়াই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।