দেশপ্রেমের নামে উগ্রতা: কোন অন্ধকারের দিকে চলেছে বিবেকানন্দ-নেতাজীর বাংলা?

A New Danger in the Name of Patriotism

বিশেষ প্রতিবেদন

দেশপ্রেমের ভাষা যখন ভালোবাসার বদলে বিদ্বেষের আর সম্প্রীতির বদলে বিভাজনের হয়ে ওঠে, তখন ইতিহাসের পাতায় রক্তক্ষরণ হয়। আমাদের চেনা বাংলা, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুভাষ-বিবেকানন্দের যে বাংলা যুগ যুগ ধরে বিশ্বকে একতার আলো দেখিয়েছে, আজ সেখানে এক কালচে অন্ধকারের ছায়া ঘনাচ্ছে।

পথে-ঘাটে আজ শুরু হয়েছে এক নতুন অসভ্যতা—‘দেশপ্রেমের পরীক্ষা’। কে কতটা খাঁটি ভারতীয়, তা মাপা হচ্ছে পোশাক, দাড়ি, টুপি কিংবা খাদ্যাভ্যাস দেখে। কয়েকজন স্বঘোষিত ‘লেঠেল’ ও উগ্র মানসিকতার সামাজিক আগাছা ঠিক করে দিচ্ছে দেশপ্রেমের সংজ্ঞা! পাজামা-পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি পরা নিরীহ মানুষকে অপমান করা, বোরখাবৃত নারীদের প্রকাশ্যে হেনস্থা করা আজ যেন এক শ্রেণীর উদয় হওয়া শক্তির কাছে বাহবা কুড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার দেশের ও আমাদের বাংলার নির্দিষ্ট এক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, যাদের অবদান ভারতের মাটিতে রক্তের অক্ষরে লেখা।

বিচূর্ণ বহুমুখী ভারত ও আক্রান্ত সম্প্রীতি

ভারতের মূল শক্তি ছিল ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’। কিন্তু আজ সেই শত ফুল ফোটার বাগানকে শুকিয়ে ফেলার চক্রান্ত চলছে। রাজনৈতিক ফায়দার জন্য হিন্দু-মুসলমানের হাজার বছরের সহাবস্থানের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে সন্দেহের বিষবাষ্প। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগেই সতর্ক করে বলে গিয়েছিলেন:

“মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস আমি হারাব না। কিন্তু যেদিন সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ বা উগ্র ধর্মীয় উগ্রতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, সেদিন জাতির পতন অনিবার্য।”

আজ সেই সংকীর্ণতাই আমাদের দরজায় করাঘাত করছে। যে উর্দুকে কেন্দ্র করে ভারতীয় সাহিত্যের এক বিশাল ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তাকে আজ সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষার ভুল আর বিকৃত ন্যারেটিভ তৈরি করে সমাজে বিভাজনের দেওয়াল তোলা হচ্ছে। ব্রিটিশের লর্ড কার্জন যেমন বঙ্গভঙ্গ করে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করতে চেয়েছিল, আজকের কিছু সংগঠন ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ফাটল ধরাতে চাইছে।

কলঙ্কিত হচ্ছে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের বাংলা

গেরুয়া বস্ত্র ছিল ত্যাগ, আত্মোৎসর্গ এবং সকল জীবকে ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু আজকের উগ্র রাজনীতি সেই পবিত্র গেরুয়াকে বানিয়ে তুলেছে আস্ফালনের হাতিয়ার। অথচ এই বাংলার ভূমিই তো শ্রীরামকৃষ্ণের “যত মত, তত পথ” শিখিয়েছিল। মা সারদা দেবী বিনা দ্বিধায় ডাকাত আমজাদকে পরম মমতায় নিজের সন্তান বলে কোলে টেনে নিয়েছিলেন। আর স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে গর্জনে বলেছিলেন:

“আমার বিশ্বাস, সর্বধর্মের সমন্বয়েই ভারতের ভবিষ্যৎ। আমি এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখি, যার মস্তিষ্ক হবে বেদান্তের আর দেহ হবে ইসলামের।”

যে বাংলায় বিবেকানন্দ ইসলামের চেতনাকে ভারতের মূল দেহের অংশ হিসেবে দেখেছেন, সেই বাংলায় আজ টুপি-দাড়ি দেখলে কটু কথা বলার সাহস কোত্থেকে পায় এই লেঠেলরা?

ইতিহাসের অবমাননা: প্রশ্নবিদ্ধ নেতাজী ও গান্ধীজী

অসভ্যতার পারদ আজ এতটাই উঁচুতে যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কদেরও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, যাঁর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এ ঢোকার সময় কোনো ধর্মীয় পরিচয় ছিল না—যেখানে শাহনওয়াজ খান, হাবিবুর রহমান, বিশ্বনাথ দাসরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রক্ত দিয়েছেন—আজ সেই নেতাজীর দেশপ্রেম ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম নিয়েও উগ্র মানসিকতার মানুষজন প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস দেখাচ্ছে! নেতাজীর স্পষ্ট বার্তা ছিল:

“ভারতে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভাজনের কোনো স্থান নেই। যে দেশপ্রেম মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় না, তা দেশপ্রেম নয়, তা এক ধরনের ব্যাধি।”

এমনকি দেশনায়ক মহাত্মা গান্ধীকে নিচু চোখে দেখা, সংবিধান বদলের দাবি তোলা কিংবা স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার অশুভ চেষ্টা প্রকাশ্যে চলছে। যারাই এর বিরোধিতা করছে, তাদের ওপর কড়া দাওয়াই বা হুংকার নামিয়ে আনা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের বিবেকের কাছে প্রশ্ন

আজ সময় এসেছে থামার এবং ভাবার।

  • আমরা কি সত্যিই এই উগ্রতার বাংলা চেয়েছিলাম?
  • যে মাটিতে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান”, সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে কি আমরা আমাদের প্রতিবেশী ভাইদের নিরাপত্তাহীনতায় ঠেলে দেব?
  • দেশপ্রেম কি রাস্তায় মানুষকে হেনস্থা করায়, নাকি দেশের প্রতিটি মানুষকে বুকে জড়িয়ে রাখায়?

মহাত্মা গান্ধী বলে গিয়েছিলেন:

“আমাদের সংস্কৃতি বিভিন্ন সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কোনো একটি সংস্কৃতি যদি অন্যদের মুছে ফেলে একচ্ছত্র হতে চায়, তবে তা দেশের আত্মাকেই হত্যা করবে।”

আজ ব্রিটিশদের থেকেও কঠিন ও অমানবিক মানসিকতার আইনি ও সামাজিক চাপ সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। সনাতন ধর্মের অপব্যাখ্যা করে উগ্রতাকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হচ্ছে, যা প্রকৃত সনাতন সংস্কৃতির আদর্শের একেবারে বিপরীত।

বাংলার সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী এবং প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের আজ সজাগ হওয়ার দিন এসেছে। দেশপ্রেম কোনো রাজনৈতিক দলের লাইসেন্স নয়, কোনো উগ্র সংগঠনের দেওয়া সার্টিফিকেট নয়। দেশকে ভালোবাসার অর্থ হলো দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসা। এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমাদের বিবেকের জাগরণ ঘটুক, উগ্রতার কালো ঢেউকে রুখে দিয়ে আবার ফিরে আসুক আমাদের ভালোবাসার, সম্প্রীতির ও ঐক্যের চিরন্তন বাংলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *