Brij Bhushan acquitted in sexual harassment case.
বিশেষ প্রতিবেদন-
নয়াদিল্লী : মহিলা কুস্তিগীরদের দায়ের করা যৌন হেনস্থার মামলায় ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের (WFI) প্রাক্তন সভাপতি তথা প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিংহকে বেকসুর খালাস দিল দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত। সোমবার (৩ আগস্ট, ২০২৪) দিল্লির অ্যাডিশনাল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ACJM) অশ্বিনী পানওয়ার এই বহুল চর্চিত মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলায় ব্রিজভূষণের পাশাপাশি সহ-অভিযুক্ত তথা ডব্লিউএফআই-এর তৎকালীন সহকারী সম্পাদক বিনোদ তোমরকেও সম্মানজনকভাবে খালাস দেওয়া হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়
আদালতে রায় ঘোষণার পর ব্রিজভূষণের আইনজীবী রাজীব মোহন সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিচারপতি দুই অভিযুক্তকেই “সম্মানজনকভাবে খালাস” (Honourably acquitted) করেছেন। আদালত রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছে যে, অভিযোগ দায়ের করতে অহেতুক বা অস্পষ্ট বিলম্ব, অভিযোগকারীদের বয়ানের মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য এবং ঘটনার পর তাঁদের আচরণ— সব মিলিয়ে অভিযোগকারীদের দাবি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
আদালতের রায়ে কার কী প্রতিক্রিয়া?
১. ব্রিজভূষণ শরণ সিংহ (স্বস্তি ও আত্মপক্ষ সমর্থন)
আদালতের বাইরে বেরিয়ে হাসি মুখে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ ব্রিজভূষণ বলেন,
“প্রথম দিনই আমি বলেছিলাম, আমার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগও যদি প্রমাণিত হয়, তবে আমি নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেব। আজ আদালত আমাকে সম্মানজনকভাবে খালাস করেছে। আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং আমার আইনজীবীদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এখন এর থেকে বেশি কিছু বলার নেই, পুরো আদেশনামা খতিয়ে দেখার পর বিশদে মন্তব্য করব।”
২. ভিনেশ ফোগাট ও মহিলা কুস্তিগীররা (আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার হুঙ্কার)
রায়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করলেও লড়াই ছাড়তে নারাজ প্রতিবাদী তারকা কুস্তিগীররা। সোশাল মিডিয়া এক্স-এ অলিম্পিয়ান ভিনেশ ফোগাট স্পষ্ট জানান, তাঁরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। ভিনেশ লেখেন: “শাসক দলের একজন শক্তিশালী নেতার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এফআইআর করতে আমাদের অনেক সাহস সঞ্চয় করতে হয়েছিল। নিজের ক্ষমতা ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে ব্রিজভূষণ অনেক মেয়েকে ভয় দেখিয়ে নাম তুলে নিতে বাধ্য করেছেন। তবুও বেশ কয়েকজন মহিলা কুস্তিগীর আদালতে দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। তবে আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত না করায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রথম দিন থেকেই সরকার ও গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ব্রিজভূষণকে রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। তবে কুস্তিগীররা আশা হারাচ্ছেন না এবং খুব দ্রুতই আইনজীবীদের মাধ্যমে দিল্লির হাইকোর্টে আপিল দায়ের করবেন।
৩. সরকারি প্রসিকিউশন পক্ষ
সরকারি কৌঁসুলি মণীশ রাওয়াত জানিয়েছেন, আদালতের বিস্তারিত আদেশনামা খতিয়ে দেখার পর উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মামলার পটভূমি: যন্তর মন্তর থেকে আইনি লড়াই
২০২৩ সালের শুরুর দিকে ভারতের ক্রীড়া জগতে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল অলিম্পিক পদকজয়ী সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগাট, বজরং পুনিয়া ও সঙ্গীতা ফোগাটদের বিক্ষোভ। নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে মাসের পর মাস রাস্তায় বসে প্রতিবাদ জানান দেশের শীর্ষসারির কুস্তিগীররা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ডব্লিউএফআই কার্যালয়, ব্রিজভূষণের সরকারি বাসভবন এবং বিদেশ সফর চলাকালীন একাধিক মহিলা কুস্তিগীর (যার মধ্যে এক নাবালিকাও ছিল) তাঁর দ্বারা যৌন হেনস্থার শিকার হন।
- সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ ও এফআইআর: আন্দোলন তীব্র হওয়ার পর এবং সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লি পুলিশ ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে জোড়া এফআইআর দায়ের করতে বাধ্য হয়।
- চার্জশিট ও বিচারপ্রক্রিয়া: ২০২৩ সালের জুন মাসে পুলিশ ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪ (শ্লীলতাহানি), ৩৫৪এ (যৌন হেনস্থা), ৩৫৪ডি (পিছু নেওয়া) এবং ৫০৬ (হুমকি) ধারায় প্রায় ১৫০০ পৃষ্ঠার চার্জশিট পেশ করে। এর মধ্যে নাবালিকা কুস্তিগীরের ক্ষেত্রে পোকসো (POCSO) আইন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, কারণ পরবর্তীতে নাবালিকা ও তার পরিবার অভিযোগ তুলে নেয়।
- দীর্ঘ আইনি লড়াই: দীর্ঘ শুনানি ও একাধিক সাক্ষীর বয়ান গ্রহণের পর ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয় এবং ৩ আগস্ট চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হলো।
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এই রায়ে আপাতত স্বস্তিতে ব্রিজভূষণ হলেও, কুস্তিগীররা হাইকোর্টের দরজায় কড়া নাড়তে চলায় ভারতীয় ক্রীড়া ও রাজনীতির অন্যতম হাই-প্রোফাইল আইনি লড়াই এখনই থামছে না।
