উৎসবের সংজ্ঞা বদল, বাঙালির শারদোৎসবে শোক! চোরবাগানে ১৯ প্রাণহানি, কাঠগড়ায় প্রশাসনের নিরাপত্তা

19 lives lost in Chorbagan; administration’s security measures under scrutiny

বিশেষ প্রতিবেদন

বাঙালির দুর্গাপুজো কি শুধুই ধর্মীয় আচার? নাকি এই পুজোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর, যেখানে ধর্মের গণ্ডি ছাপিয়ে মিলেমিশে যান নানা সম্প্রদায়, নানা মতের মানুষ? বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের পর দুর্গাপুজোর পরিচয় ও উদযাপনের ধরন বদলানোর চেষ্টা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা আলোচনা চলছে। সরকারের তরফে পুজোয় সনাতনী রীতিনীতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে, এসেছে সরকারি উদযাপনের নতুন কিছু রূপও।

কিন্তু এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেই উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা সমস্ত জাঁকজমক ম্লান করে দিয়েছে। এই বিপর্যয় শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি একাধারে প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং অন্যদিকে উৎসবের আসল অর্থ নিয়ে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।

১৯ মৃত্যু, যা শুধু পরিসংখ্যান নয়

‘দ্য হিন্দু’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, চোরবাগানের পদপিষ্টের ঘটনায় মৃত ১৯ জনের মধ্যে ১৩ জনই মহিলা। তাঁদের মধ্যে রয়েছে দু’জন নাবালিকা এবং দু’জন নাবালক ছেলেও। মৃতদের মধ্যে উত্তর ২৪ পরগনা, কলকাতা, হুগলি, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান ও নদীয়া জেলার বহু মানুষ যেমন রয়েছেন, তেমনই বিহারের মুজফ্‌ফরপুরের দুই আত্মীয়েরও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

অর্থাৎ, এই শোক কেবল কলকাতার নয়; জেলার পর জেলা থেকে আসা সাধারণ মানুষ, যাঁরা উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে শহরে এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর জীবিত ফিরে যেতে পারেননি। মৃতদের মধ্যে ১৭ বছরের এক কিশোরীর রিকশাচালক বাবা যখন বলেন, “পুজো আমাদের কাছে চিরতরে শেষ”, তখন তা কেবল একটি পরিবারের কান্না নয়, ১৯টি পরিবারের অসহনীয় যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি।

শারদোৎসব: ধর্মীয় পরিচয় নাকি সর্বজনীন মিলন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শারদোৎসব’ শব্দের মধ্যে রয়েছে ঋতু, প্রকৃতি এবং মানুষের মিলনের বৃহত্তর ভাবনা। বাংলার সর্বজনীন দুর্গাপুজো দীর্ঘদিন ধরেই ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি শিল্প, সাহিত্য ও সামাজিক সদ্ভাবের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। অতীতে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই বার্তাটি সমাজকে যেভাবে একসূত্রে বেঁধেছিল, আজ সেখানে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নতুন করে জোর দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা করা এবং বাঙালির সর্বজনীন চরিত্র—এই দু’টিকে কি পরস্পরের বিরোধী করে তোলার কোনো প্রয়োজন ছিল? দুর্গাপুজো হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব হলেও তা একই সঙ্গে বাংলার সার্বিক সংস্কৃতির অঙ্গ। একটি পরিচয়কে সামনে আনতে গিয়ে যদি মানুষের সার্বজনীন নিরাপত্তাকে আড়ালে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির পরিপন্থী।

প্রশাসনের দায়িত্ব এবং জবাবদিহির প্রশ্ন

চোরবাগানের এই বিপর্যয়কে নিছক দুর্ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতিরিক্ত ভিড়, বৃষ্টির দাপট কিংবা মাইকের কোনো ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক—প্রাথমিক কারণ যাই হোক না কেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সুরক্ষার কী ব্যবস্থা ছিল, তা আজ এক বড় প্রশ্ন।

বড় পুজো মণ্ডপগুলিতে বিপুল ভিড় হবে, তা প্রশাসনের অজানা থাকার কথা নয়। সরু রাস্তা, যাতায়াতের পথ এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্য যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার ছিল, তাতে স্পষ্টতই বড়সড় গলদ ছিল। পুজোয় রাজনৈতিক কৃতিত্ব জাহির করার হিড়িক থাকলে, তার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার দায়ও প্রশাসনকে সমানভাবে নিতে হবে। তদন্তের নির্দেশ দেওয়া এবং ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করাই শেষ কথা নয়; কোথায় গাফিলতি ছিল, তার সত্যতা জনসমক্ষে আসা অত্যন্ত জরুরি।

উৎসবের দিনগুলোতে সবার আগে মানুষের প্রাণ

পুজোকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা কিংবা সংস্কৃতির রূপ বদলের বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আজ সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো—একটি মানুষের জীবনও বহু মূল্যবান। উৎসবের আলো, জাঁকজমক বা রাজনৈতিক প্রচার কখনোই কোনো মায়ের কোল খালি হওয়ার বা কোনো বাবার বুকফাটা কান্নার বিকল্প হতে পারে না।

চোরবাগানের ১৯টি প্রাণহানি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, উৎসবের আসল সাফল্য মণ্ডপের জাঁকজমকে মাপা যায় না; বরং উৎসবে সামিল হওয়া প্রতিটি মানুষ যাতে নিরাপদে নিজের ঘরে ফিরতে পারেন, সেটাই সবচেয়ে বড় পরিমাপক। শোক প্রকাশের পাশাপাশি আজ তাই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে প্রশাসনকে—কারণ উৎসবের আনন্দের চেয়ে মানুষের জীবনের দাম সবসময়ই অনেক বেশি।