West Bengal Left Front Crisis
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট সাংবাদিক
ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, অধ্যাপক শুভাশিস দে তাঁর গবেষণায় ” এই রাজ্যে কোন প্রশ্ন ভোট জেতায়” এর উত্তর খুঁজেছেন। সেই গবেষণায় তাঁর উপলব্ধি ” এক সময় এই রাজ্যে শ্রেনী ও বামপন্থী রাজনীতি ভোটের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করত। বাম শাসনে ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যাবস্থা ও শ্রেনী ভিত্তিক সংগঠনই ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি। কিন্তু, ২০১১সালে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকে সেই ছবি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে”। ২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তিনটি বিধানসভা ও তিনটি লোকসভা নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। তাঁর বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ২০১১ য় তৃণমূল যখন ক্ষমতায় বসে তখন মুসলিম অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটে বিশেষ তারতম্য ছিল না। কিন্তু, ২০১৬ র পর থেকে ছবিটি বদলায়। ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ভোটে দেখা যায় যে কেন্দ্রে মুসলমান জনসংখ্যা বেশি সেখানে তৃণমূলের ভোট বেশি। গবেষণায় অন্যদিকে দেখা গিয়েছে, হিন্দু জনসংখ্যা বেশি এমন কেন্দ্রে একটি অর্থনৈতিক বিভাজন কাজ করেছে । দেখা গিয়েছে ওইসব কেন্দ্রে দরিদ্র হিন্দু ভোটার বিজেপির দিকে। এইখানেই লুকিয়ে রয়েছে “প্রতিশ্রুতির বাজার ” এর হাতযশ। যারা প্রশ্ন তোলেন বিভিন্ন অনুদান প্রকল্প নিয়ে তাঁরা এই তথ্য থেকে অনুদানের মহিমা সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন। এই তথ্য থেকে আর একটি বিষয় স্পষ্ট। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সরকারের পতনের পরেই ভোটে রাজনীতি আর উন্নয়নের প্রশ্নও সমাধিস্থ হয়েছে। ভোটে প্রধান নির্ধারক হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় পরিচয় আর অনুদানের প্রতিশ্রুতি। আমরা যারা পেশাগত কারণে ভোটের সময় গ্ৰাম থেকে শহরে ঘুরেছি তারা দেখেছি ২০০৬ র বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের দিনের ছবিটি। গ্ৰাম থেকে শহর ভোটের দিনে সকাল সকাল বুথে বুথে মহিলা ভোটারের বিপুল জমায়েত আমাদের বিস্মিত করেছিল। ভোটের ফল বেরোনোর পরে বোঝা গিয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর শিল্পায়নের প্রতিশ্রুতি তাঁদের ভোট কেন্দ্রে টেনে এনেছিল। রাজ্যে শিল্পায়ন হবে। শিল্পায়ন হলে ঘরের ছেলেটি, মেয়েটি, রাজ্যেই কাজ পাবে। এই স্বপ্ন আঁকা হয়েছিল। (বর্তমানে রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের লাঞ্চনার ছবিটি স্মরণ করুন) সেই স্বপ্নভঙ্গে বামপন্থার চলনে কিছু ভুল থাকতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক পাপ ছিল না। সেদিন যে আশা বৃক্ষের নিধন হয়েছিল তার শুন্যস্থানেই ভোটযুদ্ধে জেতার দুটি নিষ্ফলা সাফল্য ডাল পালা বিস্তার করেছে। এক মুসলিম ভোটের সমর্থন, দুই অনুদান ছড়িয়ে দরিদ্র হিন্দু ভোট কাছে টানা।
এর বিপরীতে নিউটনের তৃতীয় সূত্র মেনে বিজেপির মুসলমান বিরোধী নীতি জমি পেয়েছে। সিএএ -এন আর সির পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারী, ঘুষপেটিয়ার হুঙ্কার রাজ্যের রীতি, সংস্কৃতির মননের ভিত কিছুটা হলেও আলগা করেছে। এর পাশাপাশি আর একটি রাজনৈতিক প্রবনতাও গড়ে উঠেছে। সাম্প্রদায়িক পরিচিতির এই লড়াই হিন্দু মুসলমানের অক্ষ ছড়িয়ে ডালপালা মেলেছে। দেখা যাচ্ছে শাসক তৃণমূল এবং বিরোধী বিজেপি রাজবংশী, নমশুদ্র, ব্রাহ্মণ, কুর্মি, গোর্খা, লেপচা, ভুটিয়া , রাভা সহ বিভিন্ন জাতির সমর্থন জোটাতে প্রকাশ্যেই নানা তাস খেলছে। প্রশ্ন জাগে, এর শেষ কোথায়? ভোটে জেতার এই রাজনৈতিক প্রবনতা চলতে থাকলে তার পশ্চিমবঙ্গকে কোন পথে নিয়ে যাবে? আমাদের সবাইকে ভাবতে হবে। ঋত্বিক ঘটকের ভাষায় ” ভাবা প্র্যাকটিস করতে হবে”। এবং তা এখনই। কারণ, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।
