Uniform Civil Code
বিশেষ প্রতিবেদন: উত্তরাখণ্ড, গুজরাট, অসম, মহারাষ্ট্রের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code বা UCC) চালুর পথে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শুক্রবার জানিয়েছেন, আগামী সোমবার রাজ্য বিধানসভায় UCC সংক্রান্ত একটি বিল আনা হবে। বিধানসভার বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠকেও এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সরকার জানিয়েছে, বিলটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুজরাট ও অসমের মডেল অনুসরণ করা হয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি বিজেপি তাদের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারেও দিয়েছিল। (উল্লেখ্য, বিলটি এখনও বিধানসভায় পাস হয়নি।)
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) কী?
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হল এমন একটি আইন, যেখানে ধর্মভেদে আলাদা ব্যক্তিগত আইনের বদলে সকল নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি আইন প্রযোজ্য হবে।
এই আইন সাধারণত যে বিষয়গুলির সঙ্গে সম্পর্কিত—
- বিবাহ
- বিবাহবিচ্ছেদ
- ভরণপোষণ
- দত্তক গ্রহণ
- উত্তরাধিকার
- সম্পত্তির অধিকার
- অভিভাবকত্ব
অর্থাৎ, ব্যক্তিগত জীবনের এই বিষয়গুলিতে ধর্মভেদে আলাদা নিয়ম না থেকে একটি সাধারণ আইন কার্যকর করার ধারণাকেই UCC বলা হয়।
এতদিন কেন UCC চালু হয়নি?
ভারত বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব ব্যক্তিগত আইন বহু বছর ধরে প্রচলিত।
বিশেষ করে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন, খ্রিস্টান বিবাহ আইন, পারসি আইন এবং বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব প্রথা রয়েছে। তাই বহু সরকার মনে করেছে, কোনও একক আইন আনার আগে বিস্তৃত আলোচনা ও সামাজিক ঐকমত্য প্রয়োজন।
ভারতীয় সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দেয়। অন্যদিকে, সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে (রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি) বলা হয়েছে, রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তনের চেষ্টা করবে। ফলে এই দুই সাংবিধানিক দিকের ভারসাম্য নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
কোন কোন রাজ্যে ইতিমধ্যেই UCC চালু হয়েছে?
বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী—
- উত্তরাখণ্ড (প্রথম স্বাধীনোত্তর রাজ্য হিসেবে)
- গুজরাট
- অসম
এছাড়া গোয়ায় পর্তুগিজ আমল থেকে প্রচলিত একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইন কার্যকর রয়েছে। মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশও UCC কার্যকর করার পথে পদক্ষেপ নিয়েছে বা সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
UCC-তে সাধারণত কী কী থাকতে পারে?
রাজ্যভেদে কিছু পার্থক্য থাকলেও ইতিমধ্যে প্রণীত আইনগুলিতে দেখা গেছে—
- ছেলে ও মেয়ের সম্পত্তিতে সমান অধিকার
- বহুবিবাহ (Polygamy) নিষিদ্ধ
- বিবাহের বাধ্যতামূলক নথিভুক্তিকরণ
- লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিবন্ধনের বিধান
- উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অভিন্ন নিয়ম
পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত বিলে ঠিক কী কী থাকবে, তা বিল প্রকাশের পর স্পষ্ট হবে।
বিজেপি কেন UCC আনতে চাইছে?
বিজেপির বক্তব্য, সকল নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি আইন থাকলে—
- আইনের দৃষ্টিতে সমতা প্রতিষ্ঠা হবে,
- নারীদের অধিকার আরও শক্তিশালী হবে,
- বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে একক আইন কার্যকর হবে।
দলটি দীর্ঘদিন ধরেই “এক দেশ, এক আইন” নীতির অংশ হিসেবে UCC-এর পক্ষে সওয়াল করে আসছে।
বিরোধী দলগুলির আপত্তি কী?
কংগ্রেসের বক্তব্য: দলটির মতে, কোনও আইন আনার আগে সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা ও ঐকমত্য জরুরি। তাদের দাবি, UCC যেন সংবিধানের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ না করে।
তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য: তৃণমূল অতীতে জানিয়েছে, দেশের বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইনকে সম্মান জানিয়ে যে কোনও পরিবর্তন আনা উচিত। জোর করে একক আইন চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছে দলটি।
বাম দলগুলির বক্তব্য: সিপিআই(এম) সহ বাম দলগুলির দাবি, নারী-পুরুষের সমান অধিকারের পক্ষে তারা থাকলেও UCC-এর নামে ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
আসাদউদ্দিন ওয়েইসির বক্তব্য: AIMIM প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি বারবার বলেছেন, UCC সংবিধানের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে এবং সংখ্যালঘুদের ব্যক্তিগত আইনে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
এখন কী?
সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিলটি উপস্থাপিত হলে তার পূর্ণ খসড়া প্রকাশ্যে আসবে। তখনই জানা যাবে, পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত UCC-তে কী কী বিধান রাখা হয়েছে এবং তা অন্য রাজ্যগুলির আইনের সঙ্গে কতটা মিল বা অমিল রয়েছে।
Amrita Bazar বিলের খসড়া প্রকাশের পর ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি ধারা সহজ ভাষায় পাঠকদের সামনে তুলে ধরবে।
