মুখ্যমন্ত্রীকে নিকেশের ছক? বর্ধমান থেকে ধৃত জইশ জঙ্গি হামিদ, আন্তর্জাতিক চক্রান্তের যোগ

Jaish terrorist arrested from Bardhaman; targeted attack on Chief Minister planned.

বিশেষ তদন্তমূলক প্রতিবেদন

কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষনেতৃত্বের ওপর কি বড়সড় হামলার ছক কষা হচ্ছিল? পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ‘জইশ-ই-মুহাম্মদ’-এর জাল কতদূর বিস্তার করেছে রাজ্যে? বর্ধমানের একটি অভিজাত আবাসন থেকে জইশ জঙ্গি হামিদ (মতান্তরে হামিম) মণ্ডলের গ্রেফতারির পর এই জোরালো প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজ্যের প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা অলিন্দে। উদ্ধার হওয়া নথিপত্র এবং গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা আশঙ্কা করছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে টার্গেট করেই হয়তো কোনো বড়সড় অঘটন ঘটানোর পরিকল্পনা করছিল এই আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী।

রেনেসাঁ আবাসনে পুলিশি হানা: কীভাবে এল সাফল্য?

গোপন সূত্রে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে গতকাল সকালে ঠিক সকাল ৮:৩০ টা নাগাদ বর্ধমানের নবাবহাটের ‘রেনেসাঁ হাউসিং’-এ যৌথ অভিযান চালায় বর্ধমান জেলা পুলিশ এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘিরে ফেলা হয় পুরো এলাকা এবং গ্রেফতার করা হয় কাশ্মীরের জঙ্গি হামিদ মণ্ডলকে।

স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে কথা বলে জানা গিয়েছে, গত দুই থেকে তিন মাস ধরে পরিবার নিয়ে ওই আবাসনে ভাড়া থাকত হামিদ। পরিবারে তার স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়ে রয়েছে। প্রতিবেশীদের দাবি, হামিদকে খুব একটা বাইরে বের হতে দেখা যেত না, তবে তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। পেশায় গেঞ্জি কারখানার কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তির আসল রূপ যে এতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা ভাবতেই পারছেন না আশেপাশের বাসিন্দারা।

হাওড়া থেকে পাকিস্তান: জঙ্গির অপরাধের অতীত

গোয়েন্দাদের হাতে আসা প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামিদ আদতে হাওড়ার পিলখানা এলাকার বাসিন্দা। দীর্ঘদিন সে একটি গেঞ্জির কারখানায় কাজের আড়ালে নিজের আসল পরিচয় গোপন রেখেছিল। তবে তদন্তের সবচেয়ে বিস্ফোরক দিকটি হলো, হামিদ কেবল সাধারণ কোনো সদস্য নয়, সে সরাসরি পাকিস্তান থেকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিল

পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর হ্যান্ডলার হিসেবে সে রাজ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছিল। বিশেষ করে, জইশ-ই-মুহাম্মদের অতি-সক্রিয় এবং বিপজ্জনক অংশ ‘সাজ্জাদ ভাট গোষ্ঠী’-র সাথে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এই সাজ্জাদ ভাট গোষ্ঠীর সাথে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একাধিক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের যোগাযোগ এবং কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের রেকর্ড রয়েছে।

লক্ষ্য স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী: বিস্ফোরক নথিপত্র উদ্ধার

তদন্তকারীদের সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে ধৃত হামিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বেশ কিছু নথি। সূত্রের খবর, ধৃতের কাছ থেকে মিলছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর গতিবিধি, রুট ম্যাপ এবং দৈনিক সফরসূচির মতো অত্যন্ত গোপনীয় নথি।

কী কী তথ্য পাওয়া গিয়েছে হামিদের কাছ থেকে?

  • মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ে ব্যবহৃত গাড়ি এবং ভিআইপি মুভমেন্টের বিস্তারিত তথ্য।
  • কোন গাড়িতে তিনি সওয়ার হবেন এবং গাড়ি কখন ছাড়বে তার সময়সূচি।
  • মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি কতদূর যাবে, চালক কে থাকবেন এবং কোথায় গাড়ি পার্কিং করা হবে—তার নিখুঁত হিসাব।

এসটিএফ সূত্রে খবর, হামিদ এই সমস্ত স্পর্শকাতর ও অতি-গোপনীয় তথ্য নিয়মিত কাশ্মীরে তার উচ্চপদস্থ হ্যান্ডলারদের কাছে পাঠাচ্ছিল। গোয়েন্দাদের মূল মাথাব্যথার কারণ হলো, রাজ্যের এক শীর্ষ ভিআইপির সুরক্ষার এহেন তথ্য কীভাবে একজন জইশ জঙ্গির হাতে পৌঁছাল? রাজ্য প্রশাসনের ভেতরের কেউ কি এই তথ্য পাচারে যুক্ত? তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মুখ কুলুপ মুখ্যমন্ত্রীর, তৎপর নিরাপত্তা বলয়

এই চাঞ্চল্যকর গ্রেফতারি এবং নিরাপত্তা গলদের খবর সামনে আসতেই নবান্নে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন মুখ্যমন্ত্রী। তবে বিষয়টি নিয়ে বাড়তি কোনো উত্তেজনা তৈরি না করে অত্যন্ত দায়িত্বশীল অবস্থান নেন তিনি।

সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান:

“এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। আমি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। এর সাথে আন্তর্জাতিক যোগ রয়েছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িত। তাই আমার কিছু বলা উচিত নয়। আগামীকাল এসটিএফ প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিস্তারিত জানাবে।”

ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে নবান্নে জরুরি তৎপরতা শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (DGP), ডিরেক্টর অফ সিকিউরিটি এবং এসটিএফ-এর উচ্চপদস্থ কর্তারা এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসতে চলেছেন। ব্লু-প্রিন্ট পরীক্ষা করে মুখ্যমন্ত্রীর চারপাশের নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও কঠোর করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।

তদন্তে আন্তর্জাতিক কোণ: বড়সড় ছকের আশঙ্কা

এই পুরো ঘটনাটি সাধারণ কোনো অনুপ্রবেশ বা আত্মগোপনের ঘটনা নয় বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। পাকিস্তান, কাশ্মীর এবং পশ্চিমবঙ্গের ত্রিকোণ সমীকরণ তৈরি করে যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল, তার সুতো কতটা গভীরে প্রোথিত—সেটাই এখন খতিয়ে দেখছে এসটিএফ। ধৃত হামিদকে দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে। সে কাকে কাকে তথ্য পাঠাত এবং রাজ্যে তার আর কোনো সহযোগী রয়েছে কি না, তা জানতে তল্লাশি অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাও এই ঘটনার ওপর নজর রাখছে।