স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ‘দিমাগী নকশাল’ তকমায় কি ভিন্নমত দমনের নতুন চাল?

‘Intellectual Naxals’ in the Prime Minister’s Independence Day speech

বিশেষ প্রতিবেদন

অরণ্যাঞ্চলে সশস্ত্র নকশালবাদ ধ্বংসের পথেই, তবে দেশের আসল বিপদ এখন শহর ও ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ‘দিমাগী নকশাল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক নকশালরা। লালকেল্লার মঞ্চ থেকে নিজের ত্রয়োদশ স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই মন্তব্যকে ঘিরে এখন নতুন করে রাজনৈতিক ঝড় উঠেছে। একদিকে সরকারের দাবি, হিংসার পিছনের মদতদাতাদের চিহ্নিত করাই উদ্দেশ্য; অন্যদিকে বিরোধী দল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিযোগ— সাম্প্রতিক নানা ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক চাপ ঢাকতে ‘দিমাগী নকশাল’ তকমা দিয়ে আসলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার ও প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করার সুকৌশলী চাল চেলেছে শাসক শিবির।

স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জানান, চার দশক ধরে দেশের বিরাট অংশ বন্দুকের আতঙ্কে দিন কাটিয়েছে এবং নিরাপত্তা রক্ষায় ৩,৫০০-র বেশি জওয়ান প্রাণ হারিয়েছেন। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে কঠোর পদক্ষেপে লাল সন্ত্রাস এখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে।

নকশাল দমনে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাম্প্রতিক তথ্য ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নকশালবিরোধী অভিযানে বড়সড় সাফল্য মিলেছে:

  • নিকেশ ও আত্মসমর্পণ: সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ছত্তীসগঢ়, ঝাড়খণ্ড ও মহারাষ্ট্রসহ একাধিক রাজ্যে ১,০০০-এর বেশি সশস্ত্র মাওবাদী নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে। কেবলমাত্র ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের গোড়ার দিক পর্যন্ত ছত্তীসগঢ়েই পাঁচ শতাধিক নকশালকে নিকেশ করা সম্ভব হয়েছে বলে প্রশাসন জানায়।
  • সংকুচিত এলাকা: ২০১০ সালে দেশে নকশাল প্রভাবিত জেলার সংখ্যা যেখানে ১২৬টি ছিল, বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। বিগত পাঁচ-ছয় বছরে বহু মাওবাদী ক্যাডার গ্রেপ্তার হয়েছে এবং হাজার হাজার সদস্য আত্মসমর্পণ করে মূলস্রোতে ফিরেছে।

‘দিমাগী নকশাল’ তকমা: রাজনৈতিক কৌশল নাকি ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার?

মাওবাদী সহিংসতার এই বাস্তব পতনের পরও কেন হঠাৎ ‘দিমাগী নকশাল’ বিষয়টি সামনে নিয়ে এলেন প্রধানমন্ত্রী? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র আন্দোলনের সাফল্য এবং সংসদ অচল করে বিরোধী শিবিরের একজোট হওয়ার ঘটনা কেন্দ্র সরকারকে কিছুটা বিচলিত করেছে।

সমালোচকদের বক্তব্য, ঠিক যেভাবে দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক মেরুকরণের রাজনীতিকে উসকে দিতে বিশেষ ধরনের স্লোগান ব্যবহার করা হয়, কিংবা বিরোধী মতামতকে দমাতে অতীতে ‘আর্বান নকশাল’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ বা ‘দেশদ্রোহী’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে— এবারও নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হওয়া বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক ও ছাত্রদের নিশানা করতেই সুকৌশলী এই ‘দিমাগী’ তত্ত্ব সাজানো হচ্ছে।

বিরোধীদের কড়া প্রতিক্রিয়া

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সুর চড়িয়েছে বিরোধী শিবির। কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ বিষয়টিকে সরকারের “রাজনৈতিক হতাশা” আখ্যা দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে জানান, বিরোধীদের আক্রমণ করতেই প্রতিবার নতুন নতুন বিষাক্ত তকমা তৈরি করা হচ্ছে।

সিপিআই নেতা ডি. রাজা ও বামপন্থী নেতৃত্ব অভিযোগ তুলেছেন, স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় মঞ্চকেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের মতে, মূল সমস্যা যেমন বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি ও যুবসমাজের ক্ষোভ— সেগুলি থেকে নজর ঘোরাতেই সরকার এই ধরনের বয়ান তৈরি করছে। বিরোধীদের বক্তব্য, হিংসাত্মক মাওবাদী আন্দোলনকে কেউ সমর্থন করে না, কিন্তু সরকারের ভুল নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ বা বুদ্ধিজীবীরা সরব হলেই তাঁদের গায়ে ‘দিমাগী নকশাল’ দাগিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক।

তবে বিজেপি শিবিরের দাবি, এটি কোনো বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা নয়; অরণ্যের সশস্ত্র হিংসার ভিত্তি যে বুদ্ধিবৃত্তিক পর কাঠামো, দেশ ও সমাজকে রক্ষা করতে তাকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। সব মিলিয়ে, লালকেল্লার এই বক্তব্য কেন্দ্র ও বিরোধীদের মধ্যকার রাজনৈতিক লড়াইকে যে আরও তীব্র করে তুলল, তা বলাই বাহুল্য।