বেআইনি আটকের মাশুল: নয়ডা শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী আকৃতি চৌধুরীর এনএসএ প্রত্যাহার ও পুলিশ-প্রশাসনকে জরিমানা

Allahabad High Court fines police and administration for illegal detention.

বিশে্ষ প্রতিবেদন

নয়ডায় শ্রমিক আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হওয়া ২৫ বছর বয়সী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের স্নাতক আকৃতি চৌধুরীর ওপর আরোপিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’ (NSA) বাতিল করেছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। রাজ্য সরকারের দাবি ও পুরো ঘটনাটিকে “মনগড়া গল্প” বলে ব্যাখ্যা করে আদালত অবিলম্বে আকৃতিকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বেআইনিভাবে আটকে রাখার খেসারত হিসেবে তরুণী আন্দোলনকারীকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

আদালতের এই রায়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই ক্ষতিপূরণের অর্থ সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হবে না। থানা ইনচার্জ (SHO) থেকে শুরু করে জেলাশাসক (DM)—যে সমস্ত আধিকারিকরা এই বেআইনি এনএসএ জারির প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, তাঁদের বেতন থেকে এই টাকা কেটে নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, এই মামলায় নাম জড়ানো গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলাশাসক মেধা রূপম হলেন বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা।

কী ঘটেছিল নয়ডায়? ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে কর্মসংস্থান, ন্যূনতম মজুরি ও কাজের উন্নত পরিবেশের দাবিতে নয়ডার শিল্পাঞ্চলে হাজার হাজার শ্রমিক আন্দোলনে নামেন। পরে সেই প্রতিবাদ সহিংস রূপ নেয়—ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও গাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ দাবি করে, এই হিংসায় উস্কানি দিয়েছিলেন আকৃতি চৌধুরী এবং সক্রিয়কর্মী-সাংবাদিক সত্যম ভার্মা। আন্দোলন থেকে গ্রেফতার হওয়া সাতজন অ্যাক্টিভিস্টের মধ্যে তাঁরাও ছিলেন। ওই সময় গৌতম বুদ্ধ নগরের পুলিশ কমিশনার লক্ষ্মী সিং দাবি করেছিলেন, আকৃতি ও সত্যমের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে “শক্তিশালী ইলেকট্রনিক ও ভিডিওগ্রাফিক প্রমাণ” রয়েছে। এরপর ১৩ মে তাঁদের ওপর কড়া আইন ‘এনএসএ’ প্রয়োগ করে হেপাজতে রাখা হয়।

আদালতের তীব্র ভর্ৎসনা ও প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন আকৃতির আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা হেবিয়াস কর্পাস (Habeas Corpus) পিটিশনের শুনানিতে বিচারপতি অতুল শ্রীধরন এবং বিচারপতি অচল সচদেবের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্য সরকারের যুক্তি নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলে। আদালত জানতে চায়, আকৃতি যে হিংসায় বা পাথর ছুড়তে জনতাকে উস্কানি দিয়েছিলেন—তার সপক্ষে কোনো ভিডিও বা উপযুক্ত প্রমাণ কোথায়?

রাজ্য সরকার চার্জশিট পেশের কথা বললে বিচারপতি শ্রীধরন প্রশ্ন করেন, “চার্জশিট পেশ হয়ে থাকলে সাক্ষীরা তাঁকে কোথায় ও কীভাবে অভিযুক্ত করেছেন তা সরকারের আগে থেকেই জানা উচিত ছিল।” রাজ্য সময় চাইলে তা একপ্রকার খারিজ করে বিচারপতি বলেন, “আমি আর অতিরিক্ত সময় দেব না। মেয়েটি ইতিমধ্যে ৫ মাস জেলে কাটিয়েছে।”

নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে পুলিশের কাজের একাধিক অসঙ্গতিও ধরা পড়ে। সরকারি খাতায় দেখানো হয় ১২ এপ্রিল সকাল ১০টা ৫৬ মিনিটে আকৃতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু জেনারেল ডায়েরি (GD) পর্যালোচনা করে আদালত দেখে, আইনি নোটিশ তৈরির আগেই তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল। ফলে পুরো গ্রেফতারি প্রক্রিয়া ও কালানুক্রমের বৈধতা নিয়েই বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন দাঁড়িয়ে যায়।

আইনি জয়, কিন্তু মুক্তি এখনো অধরা আদালতের এই রায় আকৃতি চৌধুরীর জন্য একটি বড় আইনি জয় হলেও, তিনি এখনই জেল থেকে বের হতে পারছেন না। কারণ, নয়ডার শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১১টি এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ৫টি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন। বাকি ৬টি মামলায় জামিন না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে জেলেই কাটাতে হতে পারে।

আদালতের এই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া নাগরিকদের ওপর কড়া আইন প্রয়োগ করা এবং তাঁদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হলে প্রশাসন পার পেতে পারে না—কর্মকর্তাদের নিজেদের দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে।