ধর্ম, ধর্মগুরু এবং রাজনীতি: সামাজিক মেলবন্ধন নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ?

Religion, Religious Leaders, and Politics in Bengal

বিশেষ প্রতিবেদন

বাংলা রাজনীতির আঙিনায় সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম, ধর্মগুরু এবং রাজনীতির সমীকরণ নিয়ে নতুন আলোচনা জোরদার হয়ে উঠেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিতর্কিত তথা জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী (বাগেশ্বর ধাম সরকার)-র সান্নিধ্য লাভ, মুখ্যমন্ত্রী আবাসে অন্যান্যদের পাশাপাশি তাঁর আতিথেয়তা, কিংবা হাওড়ায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি—সব মিলিয় এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক গতির ইঙ্গিত মিলছে।

বাগেশ্বর ধামের পীঠাধীশ ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী একদিকে যেমন ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ বা গরিব কন্যাদের বিবাহের মতো জনকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে অলৌকিক শক্তির দাবি এবং ভারতকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করার জোরালো বার্তার জন্য সমানভাবে বিতর্কিত। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর মুখে ‘সনাতন ধর্মে জোয়ার’ বা ‘নয়া হিন্দুত্ববাদ’-এর কথা এবং এই জাতীয় ধর্মগুরুদের সান্নিধ্য কি নিছকই ব্যক্তিগত ভক্তি, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো গভীর কৌশলগত রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশ?

প্রশাসনিক মঞ্চে ‘সনাতন’ ও মেরুকরণের ব্যাকরণ

একদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর সরকারের সমর্থক শিবিরের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষে সনাতন মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ছিল। পাঠ্যপুস্তকের শব্দচয়ন (যেমন ‘আম্মা’ বা ‘আসমান’ জাতীয় শব্দের ব্যবহার) নিয়ে প্রশ্ন তোলা, রাস্তা আটকে ধর্মীয় আচার পালনের ওপর আপত্তি কিংবা গো-সংরক্ষণের মতো নীতিগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ধাঁচে কঠোর ও স্পষ্ট সামাজিক বার্তা দিয়ে এবং বাগেশ্বর ধাম সরকারের মতো ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এর প্রবক্তা ধর্মগুরুদের পাশে বসিয়ে বাংলায় নতুন সামাজিক মেরুকরণ তৈরি করাই সরকারের মূল রাজনৈতিক স্তম্ভ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

অন্যদিকে, বিরোধীদের মতে এই নীতি এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের রাজনীতিতে টেনে আনা রাজ্যের দীর্ঘদিনের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর প্রভাব ফেলছে। বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত বাংলায় ধর্মনিরপেক্ষতার মূল কাঠামো সুপ্রাচীন। সমালোচকদের বক্তব্য, রাজ্য রাজনীতিতে নিজেদের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় প্রতীকী রাজনীতি ও প্রথাগত ‘বাবা’ বা ধর্মগুরুদের প্রভাব ব্যবহার করা হচ্ছে।

ধর্মগুরুদের সান্নিধ্য: ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবর্তন?

ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা জনপ্রিয় ধর্মগুরুদের সঙ্গে ক্ষমতার শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বাংলায় মুখ্যমন্ত্রীর তরফে এভাবে প্রকাশ্যে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর মতো চর্চিত ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্য লাভের প্রচেষ্টা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, প্রশাসনিক কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় মঞ্চের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের এক বিশাল অংশের কাছে খুব সহজে এবং গভীরভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয়। তবে এর বিপরীত দিকটিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না—ধর্ম ও ধর্মগুরুদের কেন্দ্রিক আলোচনার ফলে মূল অর্থনৈতিক বিকাশ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির মতো মৌলিক বিষয়গুলো যেন আড়ালে চলে না যায়, তা খেয়াল রাখা জরুরি।

বাংলা কি নতুন পথে হাঁটছে?

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস ঐতিহাসিকভাবেই শ্রেণি সংগ্রাম, সার্বিক উন্নয়ন এবং সামাজিক প্রগতির ভিত্তিপ্রস্তরে গড়া। মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হয়ে শুভেন্দু অধিকারীর এই সনাতনী ভাবাবেগ, নীতিগত পরিবর্তন এবং বাগেশ্বর ধাম সরকারের মতো ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্য রাজ্যবাসীর মনস্তাত্ত্বে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা দেখার বিষয়।

প্রশাসনে ও রাজনীতিতে ধর্মের উপস্থিতি একদিকে যেমন একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস জোগায়, অন্যদিকে তা তৈরি করতে পারে নতুন সামাজিক বিতর্ক। শেষ পর্যন্ত বাংলা তার ঐতিহ্যগত সম্প্রীতি ধরে রাখবে, নাকি এক সম্পূর্ণ নতুন ধারার রাজনীতির সোপানে প্রবেশ করবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।