Controversy over attack on book stall
বিশেষ প্রতিবেদন
মতাদর্শের লড়াই হোক যুক্তিতে, বইয়ের বিরুদ্ধে বুলডোজার চালিয়ে নয়। পুজোর আবহে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বামেদের বুকস্টল ভাঙচুরের অভিযোগ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের উপর আক্রমণ নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সামনে এক গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন।
দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও মিলনের উৎসব। এই উৎসবের পরিসরে যেমন থাকে শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও সৃজনশীলতার উদ্যাপন, তেমনই থাকে নানা মত ও পথের মানুষের সহাবস্থান। কিন্তু সেই উৎসবের আবহেই যদি রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত বইয়ের স্টলে হামলা ও ভাঙচুরের রূপ নেয়, তবে তা নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর গভীরে রয়েছে গণতান্ত্রিক সহনশীলতার সংকট।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পুজোমণ্ডপের কাছে বামেদের বুকস্টল ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের আঙুল বিজেপি কর্মীদের দিকে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে রাখা জরুরি—কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা করার অর্থ কি সেই মতাদর্শের বই বিক্রির অধিকার কেড়ে নেওয়া?
এই প্রশ্নের উত্তর গণতন্ত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট। মতাদর্শের বিরোধিতা করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই সেই মতাদর্শ প্রকাশ ও প্রচারের অধিকারও রয়েছে—আইনের সীমার মধ্যে। কারও বক্তব্য অপছন্দ হলে তার প্রতিবাদ করা যায়, তার যুক্তির বিরোধিতা করা যায়, এমনকি পাল্টা বই ও পাল্টা মতাদর্শের প্রচারও করা যায়। কিন্তু ভাঙচুর, ভয় দেখানো কিংবা জোর করে কোনও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উপস্থিতি মুছে দেওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।
স্বপন দাশগুপ্তের বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বামেদের সঙ্গে তাঁর নৈতিক ও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে—এ কথা তিনি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন। কিন্তু সেই বিরোধের অর্থ এই নয় যে বামেরা বই বিক্রি করতে পারবেন না। বুকস্টলে হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যারা এই হামলা চালাচ্ছে, তাদের সেই অধিকার বা দায়িত্ব কে দিয়েছে?
এই বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই যে, রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও অন্যের গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার নীতিটি তিনি সামনে এনেছেন। রাজনীতিতে মতের অমিল থাকবেই। কিন্তু সেই অমিলের সীমারেখা কোথায় টানা হবে, সেটাই একটি রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক চরিত্রের অন্যতম পরীক্ষা।
স্বপন দাশগুপ্তের বক্তব্যে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক রয়েছে। তিনি ঘটনার নিন্দা করেছেন এবং এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই প্রত্যাশা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে নানা আলোচনা হতে পারে। কিন্তু বক্তব্যের মৌলিক বার্তাটি অস্বীকার করার উপায় নেই—কোনও রাজনৈতিক শক্তিই নিজের সমর্থকদের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অনুমতি দিতে পারে না।
বিজেপির কাছেও এটি আত্মসমীক্ষার সময়
বুকস্টল ভাঙচুরের অভিযোগ যদি বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠে, তবে দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব শুধু দায় এড়িয়ে যাওয়া নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করা, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া জরুরি।
রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার একাধিক পথ রয়েছে—জনসংযোগ, নির্বাচনী লড়াই, আদর্শের প্রচার এবং মানুষের আস্থা অর্জন। কিন্তু প্রতিপক্ষের বইয়ের স্টল ভেঙে দিয়ে তার মতাদর্শকে পরাস্ত করা যায় না। বরং তাতে রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের বদলে অসহিষ্ণুতার ছবিই সামনে আসে।
এখানে মনে রাখা দরকার, অভিযোগ উঠলেই কোনও ব্যক্তি বা দলকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু এই নীতিগত সতর্কতা কোনওভাবেই ঘটনার গুরুত্ব কমায় না। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।
বইয়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ আসলে চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আক্রমণ
একটি বইয়ের স্টল শুধু বই বিক্রির জায়গা নয়। সেখানে মানুষের হাতে পৌঁছয় ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য এবং সমাজকে দেখার বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি। কোনও বইয়ের সঙ্গে মতের মিল না-ও থাকতে পারে। কোনও রাজনৈতিক দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করাও সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু সেই প্রত্যাখ্যানের ভাষা যদি ভাঙচুর হয়, তবে তা যুক্তির পরিসরকে সংকুচিত করে।
আজ বামেদের বইয়ের স্টল আক্রান্ত হলে কেউ হয়তো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নীরব থাকবেন। কাল অন্য কোনও দলের বই, পত্রিকা কিংবা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ আক্রান্ত হলে সেই নীরবতার মূল্য অন্যদেরও দিতে হতে পারে। গণতন্ত্রে অধিকার কখনও কেবল নিজের জন্য সংরক্ষিত থাকে না। অন্যের অধিকার রক্ষা করার মধ্য দিয়েই নিজের অধিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
এখানেই রাজনৈতিক দলগুলির কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: তারা কি এমন এক সমাজ চায়, যেখানে মানুষ বইয়ের পাতায় যুক্তির লড়াই করবে, নাকি এমন এক পরিবেশ, যেখানে শক্তিশালী পক্ষ ঠিক করে দেবে কোন বই বিক্রি হবে আর কোন বই হবে না?
প্রশাসনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ পরীক্ষা, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ—সবই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুজোর মতো বড় জনসমাগমের সময়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
শুধু ঘটনার পরে নিন্দা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। কেন একাধিক জায়গায় একই ধরনের অভিযোগ উঠছে, তারও অনুসন্ধান প্রয়োজন। কোনও সংগঠিত পরিকল্পনা ছিল কি না, নাকি বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় ঘটনা ঘটেছে—তা প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তেই স্পষ্ট হওয়া উচিত। অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেমন অনুচিত, তেমনই রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণে গুরুতর অভিযোগকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
শেষ কথা: মতের লড়াই হোক, মারের নয়
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে মতাদর্শের সংঘাত নতুন নয়। বাম, ডান, মধ্যপন্থী—প্রতিটি রাজনৈতিক ধারারই নিজস্ব বক্তব্য, সমর্থক এবং বিরোধী রয়েছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই। সেই বৈচিত্র্যকে মেনে নেওয়া মানে সব মতাদর্শকে সমর্থন করা নয়; বরং বিরোধী মতের অস্তিত্বের অধিকারকে স্বীকার করা।
স্বপন দাশগুপ্তের বক্তব্য এই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে: রাজনৈতিক বিরোধিতা কি এতটাই তীব্র হতে পারে যে প্রতিপক্ষের বই বিক্রির অধিকারও অস্বীকার করা হবে?
এর উত্তর হওয়া উচিত—না, কখনওই নয়।
বইয়ের জবাব বই দিয়ে, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার জবাব গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের মাধ্যমেই দিতে হবে। পুজোর আনন্দের মধ্যে যদি বইয়ের স্টল ভাঙার শব্দ শোনা যায়, তবে তা শুধু একটি দলের পরাজয় বা অন্য দলের জয় নয়—তা আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই পরাজয়।
রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু অসহিষ্ণুতার দৃষ্টান্ত দীর্ঘদিন থেকে যায়। তাই আজ প্রয়োজন শুধু নিন্দা নয়, প্রয়োজন দায় নির্ধারণ, আইনের প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্পষ্ট অঙ্গীকার—মতাদর্শের লড়াই চলবে, কিন্তু বইয়ের উপর হামলা বরদাস্ত করা হবে না।
